শক্তি, সংকট ও আধ্যাত্মিকতা: ২০২৬ সালের নতুন বিশ্বব্যবস্থার পাঠোদ্ধার
সূচনা: এক পরিবর্তনশীল বিশ্ব
২০২৬ সালের শুরুতেই আমরা এমন এক পৃথিবীতে দাঁড়িয়ে, যা স্নায়ুযুদ্ধ-পরবর্তী বিশ্বব্যবস্থা থেকে চূড়ান্তভাবে বিচ্ছিন্ন। এই নতুন যুগ সংজ্ঞায়িত হচ্ছে ভূ-রাজনৈতিক বিভাজন, অর্থনৈতিক অস্থিরতা এবং প্রযুক্তিগত বিপ্লবের মাধ্যমে। পৃথিবীজুড়ে ক্ষমতা, অর্থনীতি এবং প্রযুক্তির দ্রুত পরিবর্তন আমাদের মধ্যে একযোগে কৌতুহল এবং অস্বস্তি তৈরি করছে। চারদিকে এক বিশৃঙ্খল ও খণ্ডিত চিত্র, যা আমাদের এক নতুন বাস্তবতার মুখোমুখি করেছে।
এই প্রবন্ধের মাধ্যমে আমরা এই নতুন যুগের সবচেয়ে প্রভাবশালী এবং আশ্চর্যজনক কিছু বাস্তবতা অন্বেষণ করব। শুধু ঘটনাপ্রবাহ নয়, বরং এই পরিবর্তনগুলো আমাদের সম্মিলিত যাত্রাপথ সম্পর্কে কী প্রকাশ করছে, তার গভীরে যাওয়ার চেষ্টা করব।
—
১. নতুন বিশ্বব্যবস্থা: শক্তি দ্বারা সংজ্ঞায়িত ক্ষমতা
২০২৬ সালের ভূ-রাজনৈতিক প্রেক্ষাপট আমেরিকার এক নতুন কৌশলগত অবস্থানের দ্বারা প্রভাবিত, যা “ডনরো মতবাদ” (Donroe Doctrine) নামে পরিচিত। এই মতবাদটি আমেরিকার বৈশ্বিক আধিপত্য থেকে সরে এসে একতরফাভাবে শুধুমাত্র আমেরিকা মহাদেশের উপর মনোযোগ কেন্দ্রীভূত করার নীতিকে প্রতিফলিত করে, যা তাদের ২০২৫ সালের জাতীয় নিরাপত্তা কৌশলে আনুষ্ঠানিকভাবে অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে।
এই মতবাদের সবচেয়ে নাটকীয় প্রকাশ ঘটে ৩ জানুয়ারি, ২০২৬ তারিখে, যখন মার্কিন সামরিক বাহিনী ভেনিজুয়েলায় অভিযান চালিয়ে রাষ্ট্রপতি নিকোলাস মাদুরো এবং তাঁর স্ত্রী সিলিয়া ফ্লোরেসকে আটক করে। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র এই অভিযানকে মাদক-সন্ত্রাসের বিরুদ্ধে একটি “সার্জিক্যাল আইন প্রয়োগকারী অভিযান” হিসেবে অভিহিত করলেও, এটি বিশ্বজুড়ে তীব্র নিন্দার জন্ম দিয়েছে। জাতিসংঘে ব্রাজিল, রাশিয়া, ফ্রান্স এবং স্পেনের মতো দেশগুলো এটিকে আন্তর্জাতিক আইনের লঙ্ঘন এবং একটি “আগ্রাসনের অপরাধ” হিসেবে আখ্যায়িত করেছে।
এই ঘটনাটি কেবল ভূ-রাজনৈতিক নয়, বরং এটি এক গভীর আধ্যাত্মিক সত্যকে সামনে নিয়ে আসে। ডনরো মতবাদকে “বন্দুকের নলের” উপর নির্ভরশীল “উনিশ শতকের রিয়েলপলিটিক”-এ প্রত্যাবর্তন হিসেবে দেখা হচ্ছে। এটি একটি পশ্চাদপসরণ—যেখানে আধুনিক বহুপাক্ষিক নীতি ত্যাগ করে ক্ষমতার এক আদিম ও ঐতিহাসিকভাবে বিপজ্জনক মডেলে ফিরে যাওয়া হচ্ছে। আমেরিকার “আইন প্রয়োগকারী অভিযান”-এর যুক্তিটি মূলত আন্তর্জাতিক আইনের মতো একটি সর্বজনীন নৈতিক কাঠামোকে অস্বীকার করে নিজেদের তৈরি করা একটি একতরফা ও দায়বদ্ধতাহীন ব্যবস্থাকে প্রতিষ্ঠা করার চেষ্টা। যখন নেতৃত্ব আল্লাহর প্রতি দায়বদ্ধতা থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ে, তখন শক্তি প্রয়োগই ক্ষমতার একমাত্র মাপকাঠি হয়ে দাঁড়ায়। কিন্তু ন্যায়বিচার ছাড়া কেবল শক্তির উপর ভিত্তি করে অর্জিত ক্ষমতা ভঙ্গুর এবং শেষ পর্যন্ত আত্ম-ধ্বংসকারী। ধার্মিকতা ও ন্যায়পরায়ণতা ছাড়া শক্তি কেবলই এক ক্ষণস্থায়ী আধিপত্যের বিভ্রম তৈরি করে।
—
২. মহা বিভাজন: ‘কে-আকৃতির’ অর্থনীতি এবং কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার হিসেব-নিকেশ
২০২৬ সালের বিশ্ব অর্থনীতি একটি অনিশ্চিত “কে-আকৃতির” (K-shaped) গতিপথে চলছে। একদিকে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (AI) এবং উন্নত বায়োটেকনোলজি একটি অতি-উৎপাদনশীল “সম্পদশালী” শ্রেণি তৈরি করছে। সমাজের সবচেয়ে ধনী ২০% পরিবারের ভোগব্যয় অর্থনীতিকে চালিত করছে, আর অন্যদিকে দরিদ্র ও মধ্যবিত্ত শ্রেণি লাগাতার মুদ্রাস্ফীতি এবং উচ্চ ঋণের চাপে এক গভীর ক্রয়ক্ষমতার সংকটের মুখোমুখি হচ্ছে। এই বিভাজন ক্রমশ স্পষ্টতর হচ্ছে, যেখানে অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি মুষ্টিমেয় কিছু মানুষের হাতে কেন্দ্রীভূত থাকছে।
কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তাকে ঘিরে থাকা ব্যাপক বিনিয়োগ নিয়ে এই বছর একটি বড় প্রশ্ন উঠেছে। বিশ্লেষকরা ২০২৬ সালকে AI-এর জন্য “প্রতিদান” বা “হিসেব দেখানোর বছর” হিসেবে দেখছেন, যেখানে সংস্থাগুলো তাদের বিপুল বিনিয়োগের বাস্তব রিটার্ন দেখতে চায়। এর ফলে একটি “টেক বাবল” বা প্রযুক্তি বুদবুদের ঝুঁকি তৈরি হয়েছে, যা ৫৭% প্রাতিষ্ঠানিক বিনিয়োগকারীর জন্য বছরের সবচেয়ে বড় উদ্বেগ।
অর্থনৈতিক এই উদ্বেগটি “উদ্দেশ্যহীন মালিকানার” ধারণাকে প্রতিফলিত করে। যখন অর্থনৈতিক সাফল্য নৈতিক দায়িত্ব এবং সকলের জন্য ন্যায্য সুফল নিশ্চিত করার লক্ষ্য থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে যায়, তখন তা আশীর্বাদের পরিবর্তে এক কঠোর আধ্যাত্মিক পরীক্ষায় পরিণত হয়। উদ্দেশ্যহীন সম্পদ ও সাফল্য সমাজে বিভেদ তৈরি করে এবং এক ধরনের শূন্যতার জন্ম দেয়।
—
৩. এজেন্টের বছর: অলৌকিক প্রযুক্তি ও তার লুকানো মূল্য
অর্থনৈতিক উদ্বেগের পাশাপাশি ২০২৬ সাল প্রযুক্তি এবং বিজ্ঞানের যুগান্তকারী সাফল্যের সাক্ষী হচ্ছে। কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার জগতে এটি “এজেন্টের বছর” (Year of the Agent) হিসেবে পরিচিতি পাচ্ছে, যেখানে “এজেন্টিক এআই” (Agentic AI) স্বায়ত্তশাসিতভাবে জটিল সমস্যা সমাধানের জন্য উৎপাদন পর্যায়ে প্রবেশ করছে। চিকিৎসাবিজ্ঞানে, সুজেট্রিজিন (Suzetrigine) নামক একটি নন-অ্যাдикটিভ ব্যথানাশক ওষুধের আগমন ঘটেছে, যা গত ২০ বছরের মধ্যে ব্যথা ব্যবস্থাপনায় প্রথম বড় উদ্ভাবন। একই সাথে, ৫০ বছরেরও বেশি সময় পর নাসার “আর্টেমিস II” মিশন একজন নভোচারী ক্রুকে চাঁদের চারপাশে প্রদক্ষিণ করতে পাঠাচ্ছে।
কিন্তু এই অবিশ্বাস্য অগ্রগতির একটি লুকানো মূল্যও রয়েছে। বিশ্বব্যাপী ডেটা সেন্টারের বিস্ফোরণ বিদ্যুৎ এবং জলের মতো সম্পদের উপর প্রচণ্ড চাপ সৃষ্টি করছে, যা পরিচ্ছন্ন শক্তি বা ক্লিন এনার্জি অর্জনের পথে বাধা হয়ে দাঁড়াতে পারে। তবে এখানেই এক গভীর parado রয়েছে: যে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা এই পরিবেশগত সমস্যার একটি কারণ, সেই AI প্রযুক্তিকেই আবার গ্রিডের “স্নায়ুতন্ত্র” হিসেবে ব্যবহার করা হচ্ছে বায়ু এবং সৌরশক্তির কার্যকারিতা বাড়ানোর জন্য।
“যখন প্রযুক্তি সেবার পরিবর্তে আধিপত্যের মাধ্যম হয়ে ওঠে, তখন তা আশীর্বাদ থাকা বন্ধ হয়ে যায়।”
এই পরিস্থিতি উদ্ভাবনের দ্বৈত প্রকৃতিকে তুলে ধরে। একই প্রযুক্তি একদিকে যেমন মানবজাতির জন্য অবিশ্বাস্য সম্ভাবনা তৈরি করছে, তেমনই অন্যদিকে মারাত্মক পরিবেশগত চ্যালেঞ্জ তৈরি করছে। এটি প্রমাণ করে যে প্রজ্ঞা এবং স্রষ্টার প্রতি সচেতনতা ছাড়া এর ব্যবহার কল্যাণ বয়ে আনতে পারে না। সমস্যা এবং সমাধান একই উৎস থেকে আসা এই জটিল বাস্তবতায় সঠিক পথ বেছে নেওয়াই আমাদের সময়ের সবচেয়ে বড় পরীক্ষা।
—
৪. প্রকৃতির প্রত্যুত্তর: পৃথিবী যখন তার সহ্যের শেষ সীমায়
২০২৬ সালে জলবায়ু পরিবর্তনের পরিণতিগুলো আর উপেক্ষা করার মতো অবস্থায় নেই। ইন্দোনেশিয়ায় ২০২৫ সালের শেষ এবং ২০২৬ সালের শুরুতে ঘটে যাওয়া বিপর্যয়কর বন্যায় ১,১৭০ জনেরও বেশি মানুষ নিহত এবং ২,৪০,০০০ এরও বেশি মানুষ বাস্তুচ্যুত হয়েছে। আচেহ এবং উত্তর সুমাত্রার মতো প্রদেশগুলিতে এই বন্যা ব্যাপক অবকাঠামোগত ক্ষতি করেছে, যার মধ্যে ৬টি বড় সেতুর পতন এবং ১০টি জল সরবরাহ ব্যবস্থার ধ্বংসযজ্ঞ অন্তর্ভুক্ত। এটি সাম্প্রতিক ইতিহাসে অন্যতম ভয়াবহ পরিবেশগত দুর্যোগ। অন্যদিকে, ইতালির মিলানো কর্টিনায় অনুষ্ঠিতব্য ২০২৬ সালের শীতকালীন অলিম্পিক “অপ্রত্যাশিত উষ্ণ” তাপমাত্রার কারণে বাধার সম্মুখীন হচ্ছে, যা কৃত্রিম বরফ তৈরির প্রচেষ্টাকে ব্যাহত করছে।
এই ঘটনাগুলো কেবল পরিবেশগত সমস্যা নয়, বরং এগুলো “আধ্যাত্মিক সূচক”। এই ধারণা অনুযায়ী, প্রকৃতি হলো ঐশ্বরিক ভারসাম্যের এক নীরব সাক্ষী। যখন মানবজাতি প্রকৃতির তত্ত্বাবধায়ক হিসেবে কাজ করার পরিবর্তে একে শোষণ করে, তখন প্রকৃতির ভারসাম্যহীনতা দুর্যোগের মাধ্যমে প্রকাশ পায়। এই বিপর্যয়গুলো সৃষ্টিজগতের প্রতি আমাদের সম্মিলিত দায়িত্বহীনতারই প্রতিফলন।
—
উপসংহার: এক ভগ্ন যুগে ঘুরে দাঁড়ানোর সন্ধান
২০২৬ সালের শুরুটা সংজ্ঞায়িত হচ্ছে একটি অদ্ভুত বৈপরীত্য দিয়ে। একদিকে অবিশ্বাস্য প্রযুক্তিগত অগ্রগতি, অন্যদিকে ভূ-রাজনৈতিক বিভাজন, অর্থনৈতিক বৈষম্য এবং পরিবেশগত সংকট। এই পরিস্থিতিতে, বিভিন্ন দেশ এবং সংস্থাকে একই সাথে একাধিক ধাক্কা সামলানোর জন্য “যৌগিক স্থিতিস্থাপকতা” (compounded resilience) অর্জন করতে হচ্ছে।
তবে প্রশ্ন হলো, এই স্থিতিস্থাপকতা আমরা কোথায় খুঁজে পাব? আরও শক্তিশালী ব্যবস্থা এবং প্রযুক্তি তৈরির মাধ্যমে, নাকি উদ্দেশ্য ও বিনয়ের এক গভীর অনুভূতিতে ফিরে যাওয়ার মাধ্যমে? এক ভাঙনের যুগে দাঁড়িয়ে, এই প্রশ্নের উত্তরই হয়তো আমাদের ভবিষ্যৎ পথ নির্ধারণ করবে।
“