মহাবিশ্বের যে রহস্যভেদে বিজ্ঞানীদের লেগেছে শত শত বছর, কুরআন তা জানিয়েছে ১৪০০ বছর আগেই



১.০ ভূমিকা

প্রাচীন জ্ঞানচর্চা এবং আধুনিক বৈজ্ঞানিক আবিষ্কারের মধ্যকার বিস্ময়কর ব্যবধান আমাদের বারবার ভাবনায় ফেলে। আজ থেকে চৌদ্দশ বছরেরও বেশি আগে অবতীর্ণ পবিত্র গ্রন্থ আল-কুরআনে মহাবিশ্ব সম্পর্কে এমন কিছু মৌলিক ও যুগান্তকারী বক্তব্য রয়েছে, যা আধুনিক বিজ্ঞানের সাম্প্রতিক আবিষ্কারের সঙ্গে আশ্চর্যজনকভাবে সঙ্গতিপূর্ণ। এই সাযুজ্য কেবল কৌতূহল জাগায় না, বরং গভীর চিন্তার দ্বারও উন্মোচন করে। আসুন, তেমনই কিছু গুরুত্বপূর্ণ দৃষ্টান্ত গভীরভাবে পর্যালোচনা করি।

২.০ সম্প্রসারণশীল মহাবিশ্ব: সপ্তম শতাব্দীর এক ঐশী ঘোষণা

সম্প্রসারণশীল মহাবিশ্বের ধারণা আধুনিক সৃষ্টিতত্ত্বের একটি মৌলিক স্তম্ভ। বিংশ শতাব্দীর তৃতীয় দশকে বিজ্ঞানী এডউইন হাবল এই তত্ত্ব প্রতিষ্ঠা করেন। কিন্তু বিস্ময়ের বিষয় হলো, এই আবিষ্কারের প্রায় তেরো শতাব্দী আগেই পবিত্র কুরআনে এ বিষয়ে স্পষ্ট ইঙ্গিত পাওয়া যায়। কুরআনে বলা হয়েছে—

> “আর আকাশকে আমরা নিজ শক্তিতে নির্মাণ করেছি, এবং নিশ্চয়ই আমরা একে ক্রমাগত সম্প্রসারিত করে চলেছি।”
(সূরা আয-যারিয়াত ৫১:৪৮)



এখানে “ক্রমাগত সম্প্রসারিত” হওয়ার ধারণাটি একটি চলমান ও অব্যাহত প্রক্রিয়ার ইঙ্গিত দেয়, যা আধুনিক জ্যোতির্বিজ্ঞানের পর্যবেক্ষণের সঙ্গে নিখুঁতভাবে সামঞ্জস্যপূর্ণ। লক্ষণীয় বিষয় হলো, অন্যান্য প্রাচীন ধর্মগ্রন্থে এই ধারণার কোনো স্পষ্ট ইঙ্গিত পাওয়া যায় না।

৩.০ বিগ ব্যাং ও একীভূত মহাবিশ্বের সূচনা

বিগ ব্যাং তত্ত্ব অনুযায়ী, মহাবিশ্বের সূচনা হয়েছিল এক অত্যন্ত ঘন ও একীভূত অবস্থান থেকে। কুরআনও সৃষ্টির প্রাথমিক অবস্থাকে প্রায় একই ভাষায় বর্ণনা করেছে—

> “অবিশ্বাসীরা কি দেখে না যে আকাশমণ্ডলী ও পৃথিবী একত্রে সংযুক্ত ছিল, অতঃপর আমরা তাদের পৃথক করে দিলাম? এবং আমরা প্রতিটি জীবন্ত সত্তাকে পানি থেকে সৃষ্টি করেছি।”
(সূরা আল-আম্বিয়া ২১:৩১)



এখানে ব্যবহৃত আরবি শব্দ ‘রাতকান’ এমন একটি অবস্থা নির্দেশ করে যেখানে সবকিছু একত্রে মিলিত ও অবিভক্ত। শব্দটির আরেকটি অর্থ ‘অন্ধকার ও ঘন সত্তা’। এই দ্বৈত অর্থ বিগ ব্যাং তত্ত্বের সিঙ্গুলারিটি ধারণার সঙ্গে গভীর সাযুজ্য বহন করে। বিশেষভাবে লক্ষণীয় যে, আয়াতটি অবিশ্বাসীদের উদ্দেশে সম্বোধিত—যেন এই রহস্য উন্মোচনের দায়িত্ব তাদের বুদ্ধিবৃত্তিক অনুসন্ধানের হাতেই ন্যস্ত।

৪.০ ভাসমান পৃথিবী: দৃষ্টির আড়ালে থাকা গতি

কুরআন অবতরণের যুগে পৃথিবীকে সম্পূর্ণ স্থির বলেই মনে করা হতো। অথচ কুরআন অত্যন্ত সূক্ষ্ম ভাষায়, প্রচলিত ধারণার সঙ্গে সরাসরি সংঘর্ষে না গিয়েও পৃথিবীর গতির ইঙ্গিত দিয়েছে—

> “তুমি পাহাড়গুলোকে স্থির মনে কর, অথচ তারা মেঘের মতো ভেসে চলে। এটি আল্লাহরই কর্মনৈপুণ্য, যিনি সবকিছুকে সুসংহতভাবে সৃষ্টি করেছেন।”
(সূরা আন-নামল ২৭:৮৯)



আয়াতটি বর্তমান কালে বর্ণিত এবং এখানে ব্যবহৃত সংযোগসূচক শব্দটি পাহাড়ের স্থির মনে হওয়া ও তাদের চলমান থাকার ঘটনাকে একই সময়ে সংঘটিত বলে নির্দেশ করে। আয়াতের শেষাংশে ‘সুসংহতভাবে সৃষ্টি’ করার উল্লেখ স্পষ্ট করে দেয়—পৃথিবী ঘূর্ণায়মান হলেও তার কাঠামোগত স্থিতি অটুট রয়েছে।

৫.০ মহাজাগতিক চক্র: সম্প্রসারণ, সংকোচন ও পুনঃসৃষ্টি

কিছু বৈজ্ঞানিক তত্ত্ব মহাবিশ্বের অনন্ত সম্প্রসারণের কথা বললেও, কুরআন একটি চক্রাকার মহাজাগতিক পরিণতির ধারণা উপস্থাপন করে—

> “সেই দিনকে স্মরণ কর, যেদিন আমরা আকাশকে গুটিয়ে নেব, যেমন লেখা গুটিয়ে নেওয়া হয়।”
(সূরা আল-আম্বিয়া ২১:১০৫)



এরপরই ঘোষণা করা হয়—

> “যেভাবে আমরা প্রথম সৃষ্টি শুরু করেছিলাম, সেভাবেই আমরা পুনরায় সৃষ্টি করব—এটি আমাদের অঙ্গীকার।”



এটি সৃষ্টি, সংকোচন ও পুনঃসৃষ্টির এক চিরন্তন ধারার ইঙ্গিত দেয়, যা আধুনিক কসমোলজির কিছু মডেলের সঙ্গে বিস্ময়করভাবে সাদৃশ্যপূর্ণ।

৬.০ এক অভিন্ন গন্তব্যে ধাবমান মহাবিশ্ব

কুরআন মহাবিশ্বের কোনো কিছুকেই স্থির বলে চিহ্নিত করে না। বরং ঘোষণা করে—সবকিছুই নিজ নিজ কক্ষপথে ভেসে চলছে। সূর্য সম্পর্কেও কুরআন একটি বিশেষ দিকনির্দেশনা দেয়—

> “সূর্য চলমান তার নির্ধারিত গন্তব্যের দিকে—এটি পরাক্রমশালী ও সর্বজ্ঞ আল্লাহর নির্ধারণ।”
(সূরা ইয়াসিন ৩৬:৩৯)



এর তাৎপর্য হলো—যদি সূর্য নিজেই একটি চূড়ান্ত গন্তব্যের দিকে অগ্রসর হয়, তবে তার সঙ্গে সমগ্র সৌরজগত ও বৃহত্তর মহাবিশ্বও এক সম্মিলিত অভিযাত্রায় নিয়োজিত।

৭.০ উপসংহার

মহাবিশ্ব সম্পর্কে কুরআনের এই গভীর অন্তর্দৃষ্টিগুলো আধুনিক বিজ্ঞানের বহু শতাব্দী আগেই মানবজাতির সামনে উপস্থাপিত হয়েছে। এ বাস্তবতা পাঠককে এক অনিবার্য প্রশ্নের মুখোমুখি দাঁড় করায়—চৌদ্দশ বছর আগে আরবের মরুভূমিতে বসবাসকারী এক নিরক্ষর ব্যক্তির কাছে কীভাবে এমন সুগভীর ও নির্ভুল জ্ঞান পৌঁছাতে পারে?

এই প্রশ্নের উত্তর অনুসন্ধানই হয়তো মানুষকে বিজ্ঞান থেকে বিশ্বাসের, আর বিশ্বাস থেকে সত্যের পথে নিয়ে যায়।

Leave a Comment