যখন পৃথিবী ক্লান্ত, তখন কিছু মানুষ ভালোবাসার কথা বলতে আসে
মিসিসাগা, অন্টারিও।
পৃথিবীটা আজকাল খুব ব্যস্ত। এতটাই ব্যস্ত যে, মানুষের মুখের দিকে তাকানোর সময়ও যেন তার নেই।
টেলিভিশন খুললেই যুদ্ধ। মোবাইলের পর্দায় আগুন। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে রাগের বন্যা। মানুষ আজকাল খুব সহজে রেগে যায়, খুব সহজে বিচার করে, খুব সহজে ঘৃণা করে। অথচ ভালোবাসতে গেলে একটু সময় লাগে। একটু ধৈর্য লাগে। একটু মানুষ হতে হয়।
এই অদ্ভুত সময়েই কানাডার মাটিতে শুরু হলো এক ভিন্ন ধরনের সমাবেশ।
এখানে কেউ যুদ্ধের ভাষণ দিতে আসেনি। কেউ ক্ষমতার হিসাব কষতে আসেনি। কেউ কাউকে হারাতে চায় না। বরং সবাই যেন একটি কথাই মনে করিয়ে দিতে এসেছে—মানুষ হওয়াটা এখনো সম্ভব।
এটাই আহমদিয়া মুসলিম জামাত কানাডার ৪৮তম জালসা সালানা—কানাডার সবচেয়ে বড় এবং সবচেয়ে পুরোনো মুসলিম বার্ষিক সম্মেলন।
তিন দিনের এই আয়োজনের প্রাণে একটি ছোট্ট বাক্য—
“সবার প্রতি ভালোবাসা, কারও প্রতি বিদ্বেষ নয়।”
বাক্যটি ছোট। কিন্তু পৃথিবীর ইতিহাসে বড় বড় যুদ্ধের পাশে দাঁড় করালে বোঝা যায়, মানুষের সবচেয়ে বড় শক্তি কখনো অস্ত্র ছিল না। ছিল ভালোবাসা।
অনেকেই ভাবেন, পৃথিবী বদলাবে বড় বড় রাষ্ট্রনেতাদের বৈঠকে। হয়তো বদলাবে। কিন্তু একজন মানুষ যদি নিজের ভেতরের রাগকে জয় করতে না পারেন, তবে কোনো চুক্তিই স্থায়ী শান্তি আনতে পারে না।
সংবাদ সম্মেলনে বক্তারা ঠিক এই কথাটিই অন্যভাবে বললেন।
তাঁদের মতে, শান্তির শুরু জাতিসংঘের কোনো সভাকক্ষে নয়। তার শুরু নিজের ভেতরে। তারপর ঘরে। তারপর প্রতিবেশীর সঙ্গে সম্পর্কের ভেতর। একসময় সেই শান্তিই সমাজে ছড়িয়ে পড়ে।
শুনতে খুব সহজ লাগে।
আসলে সবচেয়ে কঠিন কাজগুলোই সাধারণত সবচেয়ে সহজ ভাষায় বলা হয়।
একটি বাক্য বারবার ফিরে এল—
“ঘৃণা কখনো ঘৃণাকে পরাজিত করতে পারে না।”
কথাটি নতুন নয়। কিন্তু পৃথিবী বারবার ভুলে যায়।
এই সম্মেলনের গল্প শুরু হয়েছিল আজ থেকে একশো পঁয়ত্রিশ বছর আগে।
১৮৯১ সালে ভারতের ছোট্ট শহর কাদিয়ানে মাত্র পঁচাত্তর জন মানুষকে নিয়ে প্রথম জালসা বসেছিল। কেউ তখন কল্পনাও করেনি, একদিন সেই ছোট্ট সমাবেশ পৃথিবীর দুই শতাধিক দেশে পৌঁছে যাবে।
বীজ যখন মাটিতে পড়ে, তখন তাকে দেখে কেউ বন কল্পনা করতে পারে না।
কিন্তু প্রকৃতি পারে।
ইতিহাসও পারে।
আজ কানাডায় এই সম্মেলনে আসছেন পঁচিশ হাজারেরও বেশি মানুষ। তাঁদের জন্য রান্না হচ্ছে প্রায় দুই লক্ষ খাবার। এই বিশাল আয়োজনের পেছনে কাজ করছেন পাঁচ হাজারেরও বেশি স্বেচ্ছাসেবক।
মজার বিষয় হলো, এদের অধিকাংশের নাম কেউ জানবে না।
সংবাদপত্রে তাঁদের ছবি ছাপা হবে না।
মঞ্চে তাঁদের ডাকা হবে না।
তবু তাঁরা হাসিমুখে কাজ করবেন।
কারণ তাঁরা বিশ্বাস করেন, মানুষের সেবা এমন একটি কাজ, যার সবচেয়ে বড় পুরস্কার মানুষ দেয় না—আল্লাহ দেন।
জাতীয় আমির জনাব লাল খান মালিক বললেন, পৃথিবীতে শান্তি চাইলে মানুষের সঙ্গে সম্পর্ক যেমন ঠিক করতে হবে, তেমনি স্রষ্টার সঙ্গেও সম্পর্ক গড়তে হবে।
কথাটি শুনে মনে হলো, মানুষ আসলে দুটি সম্পর্কের মাঝখানে দাঁড়িয়ে থাকে। একটি আকাশের দিকে যায়। আরেকটি পৃথিবীর মানুষের দিকে।
একটি দুর্বল হলে অন্যটিও টেকে না।
এই জালসার আরেকটি সৌন্দর্য হলো—এটি শুধু আহমদিদের জন্য নয়।
এখানে দরজা খোলা সবার জন্য।
আপনি মুসলমান হতে পারেন, হিন্দু, খ্রিস্টান, ইহুদি, শিখ কিংবা কোনো ধর্মেই বিশ্বাস না-ও করতে পারেন। তাতে কিছু আসে যায় না।
এসে বসুন।
চা খান।
কথা বলুন।
প্রশ্ন করুন।
মানুষকে কাছ থেকে দেখুন।
দূর থেকে মানুষকে বিচার করা খুব সহজ।
কাছে এলে দেখা যায়, ভিন্ন ধর্মের মানুষও সন্তানের জন্য একই রকম দোয়া করেন। একই রকম কষ্ট পান। একই রকম হাসেন।
শেষ পর্যন্ত মানুষ আসলে মানুষের কাছেই ফিরে আসে।
জালসা সালানা কয়েক দিনের মধ্যেই শেষ হয়ে যাবে।
মঞ্চ খুলে ফেলা হবে।
চেয়ারগুলো গুছিয়ে রাখা হবে।
স্বেচ্ছাসেবকেরা নিজেদের বাড়িতে ফিরে যাবেন।
কিন্তু যদি এই কয়েক দিনে একজন মানুষও সিদ্ধান্ত নেন—তিনি আর কাউকে ঘৃণা দিয়ে নয়, সম্মান দিয়ে বিচার করবেন; তিনি প্রতিবেশীর খোঁজ নেবেন; তিনি ভিন্ন বিশ্বাসের একজন মানুষের সঙ্গে হাসিমুখে করমর্দন করবেন—তবে এই সম্মেলনের উদ্দেশ্য পূরণ হবে।
কারণ পৃথিবীকে বদলে দেওয়ার জন্য সব সময় বড় বিপ্লব লাগে না।
কখনো কখনো একজন ভালো মানুষেরই যথেষ্ট।
হয়তো সেই মানুষটি আপনার পাশেই বসে আছেন।