
টরন্টোর আকাশে মেঘ, প্যান্ডেলে কান্নার শব্দ এবং একজন সিংহের বাচ্চার গল্প
-সাঈফুল ইসলাম
টরন্টোর আকাশে আজ সকাল থেকেই মেঘের আনাগোনা। এই শহরের মেঘগুলোর মন-মেজাজ বোঝা বড় দায়। হুট করে রোদ, হুট করে ঝমঝমিয়ে বৃষ্টি। তবে আজ বিকেলে টরন্টোর আন্তর্জাতিক কনভেনশন সেন্টারের বিশাল প্যান্ডেলটার নিচে যে মেঘ জমেছে, তা আকাশের নয়—তা মানুষের মনের ভেতরের এক অদ্ভুত মায়ার মেঘ।
হয়ে গেল ২০২৬ সালের কানাডার জলসা সালানার সমাপনী অধিবেশন। ২৪ হাজার ২৮৬ জন মানুষের গমগমে মেলা। হিসাবটা বেশ মজার—পুরুষদের চেয়ে মহিলারা কিন্তু খুব একটা পিছিয়ে নেই; সাড়ে বারো হাজার পুরুষের বিপরীতে নারী ছিলেন প্রায় পৌনে বারো হাজার! পৃথিবীর ৩০টি দেশ থেকে ডানায় ভর দিয়ে মানুষগুলো ছুটে এসেছে এই টরন্টোর মাটিতে।
মানুষ বড় আজব কলকব্জা। সে দেশ ছাড়ে, ঘর ছাড়ে, রূপকথার মতো সাত সমুদ্র তেরো নদী পার হয়ে যায়। কিন্তু ভেতরের টানটাকে কিছুতেই ছাড়তে পারে না। ওটা জঁকের মতো কলিজায় কামড়ে ধরে রাখে।”
লোহিত সাগর এবং কিছু ভুলে যাওয়া মানুষ
মঞ্চে তখন সমাপনী বক্তব্য চলছে। বক্তা যখন কথা বলছিলেন, তখন পুরো প্যান্ডেলে এমন নীরবতা যে একটা সূচ পড়লেও বুঝি শব্দ হতো। তিনি বলছিলেন মানুষের এক প্রাচীন স্বভাবের কথা—মানুষ যখন ঘোর বিপদে পড়ে, তখন সে ঈশ্বরকে চেনে, বিড়বিড় করে ডাকে। আর যেই বিপদ কেটে গিয়ে একটু আরাম আয়েশ চলে আসে, অমনি সে বুক ফুলিয়ে বলে, “এ তো আমার নিজের বুদ্ধিতে হয়েছে! আমি মস্ত বুদ্ধিমান!” মানুষের মতো অকৃতজ্ঞ আর স্মৃতিভ্রষ্ট জীব বোধহয় পৃথিবীতে আর দুটি নেই।
সেখানেই উঠে এলো মিশরের দাসত্ব থেকে মুক্ত হওয়া বনী ইসরাইলের সেই গল্পটা। লোহিত সাগর দুভাগ হয়ে পথ করে দিল, মরুভূমিতে আকাশ থেকে নামল খাবার, পাথরের বুক চিরে বের হলো ঠান্ডা পানির ফোয়ারা। এত অলৌকিক কাণ্ড চোখের সামনে দেখেও, যখন আসল পরীক্ষার সময় এলো, যখন ত্যাগের ডাক এলো, তখন তারা হাত-পা গুটিয়ে বসে বলল—”হে মুসা, তুমি আর তোমার রব গিয়ে যুদ্ধ করো, আমরা বরং এখানে একটু আরাম করে বসি।”
ফলাফল কী হলো? ৪০ বছর তারা মরুভূমিতে উদ্দেশ্যহীনভাবে ঘুরে মরল। অলৌকিকত্ব দেখা সেই পুরো প্রজন্মটা কোনোদিন প্রতিশ্রুত ভূমিতে পা-ই রাখতে পারল না। পা রাখল তাদের সন্তানরা।
বক্তা যখন চশমাটা ঠিক করে নিয়ে বললেন, “এই গল্পটা কোনো প্রাচীন ইতিহাস নয়, এটা আমাদের নিজেদের মুখের আয়না,” তখন প্যান্ডেলের প্রথম সারিতে বসা এক বৃদ্ধ শ্মশ্রুমণ্ডিত ভদ্রলোককে পকেট থেকে রুমাল বের করতে দেখা গেল।
আসলেই তো! এই যে আজ কানাডায় এত চাকচিক্য, এত সুখ, এর পেছনে একটা ফেলে আসা ইতিহাস আছে না? এই মানুষগুলোর অনেকেই তো একদিন সব হারিয়ে, উদ্বাস্তু হয়ে কিংবা চরম অনিশ্চয়তার সমুদ্র পেরিয়ে এই নিরাপদ উপকূলে এসে দাঁড়িয়েছিলেন। কনকনে শীতের কানাডায় যখন তারা প্রথম পা রেখেছিলেন, অনেকের গায়ে হয়তো ঠিকঠাক একটা লংশার্ট বা জ্যাকেটও ছিল না। আজ ঈশ্বর তাদের দুহাত ভরে দিয়েছেন—গাড়ি, বাড়ি, সম্মান, সন্তানের পড়াশোনা। কিন্তু কেন দিয়েছেন? শুধু কি একটু আরাম-আয়েশে ম্যাকডোনাল্ডসের বার্গার খাওয়ার জন্য? নাকি কোনো বড় উদ্দেশ্যের বীজ হিসেবে তাদের এই দূর দেশে রোপণ করা হয়েছে?
সিংহের বাচ্চা যখন ভেড়ার পালে ম্যাঁ ম্যাঁ করে
বক্তৃতার মাঝখানে চমৎকার একটি রূপক এল—এক সিংহের বাচ্চার গল্প। ছোটবেলায় সে হারিয়ে গিয়ে এক ভেড়ার পালের সাথে বড় হয়েছে। সে ঘাস খায়, ভেড়াদের মতো সুর করে ‘ম্যাঁ ম্যাঁ’ করে আর আসল সিংহ দেখলে ভয়ে লেজ গুটিয়ে পালায়। কারণ সে তো জানেই না যে তার ভেতরে সিংহের রক্ত! একদিন নদীর টলটলে পরিষ্কার জলে নিজের ছায়া দেখে সে চমকে উঠল—আরে! আমি তো ভেড়া নই, আমি তো বনের রাজা সিংহ! ব্যস, এক লাফে সে গিয়ে মিশে গেল নিজের আস্তানায়।
কানাডার এই বিলাসবহুল, নাগরিক জীবনে এসে আমরাও কি নিজেদের পরিচয় ভুলে ভেড়ার পালের মতো দিন কাটাচ্ছি না? বক্তা স্পষ্ট করে মনে করিয়ে দিলেন, প্রতিটি মানুষ এখানে ইসলামের একেকজন দূত, একেকজন অ্যাম্বাসেডর। গ্রোসারি শপের ক্যাশিয়ার থেকে শুরু করে পাশের বাড়ির কানাডিয়ান প্রতিবেশী—সবাই কিন্তু ইসলামকে চিনবে আপনার পিএইচডি ডিগ্রি বা ব্যাংকের ব্যালেন্স দেখে নয়; তারা ইসলামকে চিনবে আপনার চরিত্র দেখে, আপনার সততা দেখে।
ট্যাক্স ফাঁকি দেওয়া, সরকারি সুযোগ-সুবিধার অপব্যবহার করা—এসবের ভেতর কোনো চতুরতা নেই, বরং গ্লানি আছে। নবী মুহাম্মদ (সা.) নবী হওয়ার আগে মক্কায় পরিচিত ছিলেন ‘আল-আমীন’ বা পরম বিশ্বাসী হিসেবে। মানুষ তাঁর বাণী শোনার আগে তাঁর অমায়িক চরিত্র দেখেছিল।
শেষ বিকেলের কান্না ও এক পশলা সোনালী রোদ
ডিজিটাল দুনিয়ার কিছু হিসাব-নিকাশও জানা গেল। এবারের এই বিশাল যজ্ঞ সামলাতে ৬ হাজার ১৭০ জন তরতাজা ভলান্টিয়ার দিনরাত খেটেছেন। কোনো পারিশ্রমিক নেই, শুধু এক চিলতে হাসিমুখে তারা মানুষের সেবা করে গেছেন। আর প্রযুক্তির কল্যাণে এমটিএ (MTA) এর মাধ্যমে প্রায় ৮২ হাজার মানুষ লাইভ অনুষ্ঠানটি দেখেছেন, সোশ্যাল মিডিয়ায় ভিউ ছাড়িয়েছে ১.৩ মিলিয়নেরও বেশি।
সবশেষে এলো সেই মাহেন্দ্রক্ষণ। নীরব মোনাজাত—সাইলেন্ট প্রেয়ার।
২৪ হাজার মানুষ একসঙ্গে হাত তুললেন। প্যান্ডেলের ভেতরটা তখন এতটাই শান্ত যে, বাইরে পাইন গাছের পাতায় বাতাসের ফিসফিসানিও স্পষ্ট শোনা যাচ্ছিল। মানুষের ঠোঁট নড়ছে না, কিন্তু চোখ দিয়ে টপটপ করে জল গড়িয়ে পড়ছে। কেউ কাঁদছেন ফেলে আসা শৈশবের জন্য, কেউ কাঁদছেন ঘরের কোণে পড়ে থাকা বুড়ো বাবা-মায়ের স্মৃতিকাতরতায়, আর কেউ বা কাঁদছেন ঈশ্বরের দরবারে নিজের অস্তিত্বের ঋণ স্বীকার করে।
প্রার্থনা শেষ হলো। মানুষজন আস্তে আস্তে প্যান্ডেল থেকে বের হয়ে আসছেন। টরন্টোর আকাশের মেঘগুলো কেমন জাদুর মতো কেটে গেছে। সেখান থেকে এক পশলা সোনালী রোদ এসে পড়েছে মানুষের মুখে। মানুষগুলো যার যার গাড়ির দিকে হেঁটে যাচ্ছেন ঠিকই, তবে বুক পকেটে করে নিয়ে যাচ্ছেন এক দারুণ মায়া আর জিদ—তারা কেবল অভিবাসী নন, তারা এক মহান উদ্দেশ্যের বীজ, যাদের ছড়িয়ে দেওয়া হয়েছে পৃথিবীর এই প্রান্তে, একদিন এক বিশাল মহীরুহ হয়ে ওঠার আশায়।
মানুষের জীবনটা আসলেই বড় সুন্দর, যদি তার পেছনে একটা মহৎ উদ্দেশ্য থাকে!