**লন্ডন থেকে**
শান্তির কোনো বিমানবন্দর নেই। সেখানে পৌঁছানোর জন্য বোর্ডিং পাস লাগে না। লাগে শুধু একটি নরম হৃদয়।
এই কথাটা আমার মনে এলো লন্ডনের হাদীকাতুল মাহদীতে দাঁড়িয়ে। চারদিকে হাজার হাজার মানুষ। কারও ভাষা আরবির মতো শোনায়, কেউ ফরাসি বলছে, কেউ আফ্রিকার কোনো অচেনা ভাষায় হাসছে। শিশুদের হাসির ভাষা অবশ্য পৃথিবীর সব জায়গায় একই।
পৃথিবী আজ অদ্ভুত এক সময় পার করছে। যুদ্ধের খবর এত বেশি যে, কখনো কখনো মনে হয় শান্তি যেন সংবাদপত্রের শেষ পাতায় হারিয়ে যাওয়া একটি ছোট খবর। অথচ এই বিশাল সমাবেশে এসে মনে হলো, মানুষ এখনো একে অপরকে বিশ্বাস করতে চায়। শুধু সেই সুযোগটা খুব কম পায়।
জালসা সালানা ২০২৬ আমাকে পাঁচটি ছোট গল্প শোনাল। গল্পগুলো আসলে মানুষের।
প্রথম গল্পটি মরিশাসের রদ্রিগেজ দ্বীপের। সেখানে মুসলমানের সংখ্যা খুবই কম। কিন্তু তৃষ্ণার্ত মানুষের সংখ্যা ধর্ম দেখে বাড়ে না। তাই *Humanity First* সেখানে পানির ব্যবস্থা করেছে, স্বাস্থ্যসেবা পৌঁছে দিয়েছে মানুষের ঘরে। তখন মনে হলো, মানবতার অভিধানে “আপনি কোন ধর্মের?”—এই প্রশ্নটি নেই। সেখানে শুধু একটি প্রশ্ন লেখা আছে—”আপনার কী প্রয়োজন?”
দ্বিতীয় গল্পটি একজন আইনজীবীর। ডেভিড ম্যাটাস বলছিলেন, ন্যায়বিচার নিজে থেকে আসে না; তাকে নিয়ে আসতে হয়। কথাটি শুনে মনে পড়ল গ্রামের সেই পুরোনো কুয়োর কথা। যত গভীরই হোক, পানি তুলতে দড়ি ফেলতেই হয়। ন্যায়বিচারও তেমন। অপেক্ষা করলে আসে না, চেষ্টা করলে আসে।
তৃতীয় গল্পটি ছিল একসঙ্গে বসে থাকার গল্প। কানাডার আদিবাসী সম্প্রদায়ের প্রতিনিধিরা এসেছেন। ভিন্ন ইতিহাস, ভিন্ন সংস্কৃতি, ভিন্ন অভিজ্ঞতা—তবু একই টেবিলে বসে কথা বলছেন। পৃথিবীর অনেক যুদ্ধ হয়তো শুরুই হতো না, যদি মানুষ আগে একটু মন দিয়ে অন্যের কথা শুনত।
চতুর্থ গল্পটি সবচেয়ে নীরব। একশ বছর আগে ভারতের কিছু সাধারণ নারী নিজেদের গয়না বিক্রি করেছিলেন। সেই অর্থে গড়ে উঠেছিল লন্ডনের ফজল মসজিদ। তাঁরা ইতিহাস লিখতে বসেননি। তাঁরা শুধু একটি ভালো কাজ করেছিলেন। কিন্তু ভালো কাজেরও দীর্ঘ জীবন আছে। কখনো কখনো মানুষের চেয়েও দীর্ঘ।
পঞ্চম গল্পটি সাহসের। ব্রিটিশ এমপি ফ্লুর অ্যান্ডারসন বললেন, শান্তি মানে শুধু যুদ্ধ না থাকা নয়; শান্তি মানে প্রতিদিন শান্তির পক্ষে দাঁড়ানো। আর যখন স্যার এড ডেভি ও লর্ড অল্টন ধর্মীয় নিপীড়নের শিকার মানুষের অধিকারের কথা বললেন, তখন বুঝলাম—মানবাধিকার তখনই সত্যিকারের মানবাধিকার, যখন তা নিজের জন্য নয়, অন্যের জন্যও দাবি করা হয়।
এই কয়েক দিনে আমি একটি বিষয় শিখেছি। পৃথিবীকে বদলে দেওয়ার মানুষ খুব কম। কিন্তু পৃথিবীকে একটু সুন্দর করে দেওয়ার মানুষ অনেক হতে পারে। একজন একটি গাছ লাগাতে পারেন। একজন কারও হাত ধরতে পারেন। একজন অন্যায়ের বিরুদ্ধে একটি বাক্য বলতে পারেন। আর একজন ক্ষুধার্ত মানুষকে একটি রুটিও দিতে পারেন। শান্তির শুরু সম্ভবত এখানেই।
ফিরতি বিমানে বসে জানালার বাইরে মেঘ দেখছিলাম। মেঘের কোনো সীমান্ত নেই। বাতাসেরও নেই। ভালোবাসারও থাকার কথা নয়।
আমরা প্রায়ই ভাবি, পৃথিবী বদলাবে রাষ্ট্রনায়কদের সিদ্ধান্তে। হয়তো বদলাবে। কিন্তু তার আগে বদলাতে হবে আমার ভেতরের ছোট্ট পৃথিবীটাকে। কারণ ঘৃণার শুরু যেমন একজন মানুষ থেকে, ভালোবাসার শুরুটাও ঠিক একজন মানুষ থেকেই।
হয়তো সেই মানুষটি আমি। হয়তো আপনি।
আর যদি সত্যিই তা হয়, তাহলে শান্তির ঠিকানাটা খুব দূরে নয়। সেটি আমাদের হৃদয়ের মধ্যেই।