ব্যথার ওপারে এক সকাল


সিকল সেল রোগের চিকিৎসায় জিন-সম্পাদনার নতুন দিগন্ত—বিজ্ঞান আশার দরজা খুলেছে, কিন্তু সেই দরজা সবার জন্য এখনো সমানভাবে উন্মুক্ত নয়

সাঈফুল ইসলাম

একটি শিশু জানে, বিকেল হলে মাঠে যেতে হয়।

সে জানে, বন্ধুরা অপেক্ষা করে।
জানে, দৌড়াতে ভালো লাগে।
জানে, বৃষ্টিতে ভিজলে মা বকবেন।

কিন্তু সে এটাও জানে—তার শরীর সব সময় তাকে অনুমতি দেয় না।

হঠাৎ ব্যথা শুরু হলে খেলা থেমে যায়। স্কুলে যাওয়া বন্ধ হয়। কখনো রাতের ঘুমও হারিয়ে যায়। হাসপাতালের সাদা দেয়াল তখন তার কাছে পরিচিত হয়ে ওঠে।

মা পাশে বসে থাকেন। সন্তানের কপালে হাত রাখেন। বাবা হাসপাতালের করিডরে এদিক-ওদিক হাঁটেন।

আর শিশুটি হয়তো একসময় খুব স্বাভাবিক একটি প্রশ্ন করে—

‘আমি আবার কবে খেলতে পারব?’

এই প্রশ্নের উত্তর বদলে দেওয়ার সম্ভাবনাই এখন তৈরি করেছে আধুনিক জিন-চিকিৎসা।

—

রোগের সঙ্গে লড়াই নয়, রোগের মূলেই আঘাত

সিকল সেল ডিজিজ একটি বংশগত রক্তরোগ। এ রোগে হিমোগ্লোবিনের অস্বাভাবিকতার কারণে লোহিত রক্তকণিকা স্বাভাবিক গোলাকার আকৃতি হারিয়ে কাস্তের মতো বাঁকা হয়ে যেতে পারে। ফলে রক্তনালিতে বাধা সৃষ্টি হয়, দেখা দিতে পারে তীব্র ব্যথা, রক্তস্বল্পতা এবং শরীরের বিভিন্ন অঙ্গের ক্ষতি।

এতদিন চিকিৎসার বড় অংশ ছিল রোগের জটিলতা সামলে রাখা—ব্যথা নিয়ন্ত্রণ, রক্ত সঞ্চালন এবং অন্যান্য উপসর্গের চিকিৎসা।

জিন-চিকিৎসা প্রশ্নটি তুলেছে একটু অন্যভাবে—

রোগ দেখা দেওয়ার পর তার সঙ্গে লড়াই করব কেন? রোগের পেছনের জিনগত সমস্যাটিই যদি বদলে দেওয়া যায়?

এই চিন্তা থেকেই এসেছে নতুন চিকিৎসার পথ।

২০২৩ সালের ডিসেম্বরে যুক্তরাষ্ট্রের খাদ্য ও ওষুধ প্রশাসন (FDA) সিকল সেল রোগের জন্য Casgevy ও Lyfgenia নামের দুটি জিন-ভিত্তিক চিকিৎসার অনুমোদন দেয়। এর মধ্যে Casgevy বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য। এটি CRISPR/Cas9 জিন-সম্পাদনা প্রযুক্তি ব্যবহার করা প্রথম FDA-অনুমোদিত চিকিৎসা।

শুনতে অনেকটা ভবিষ্যতের কোনো গল্পের মতো।

কিন্তু গল্পটি এখন বাস্তব।

—

শরীরের নিজের কোষ দিয়েই নতুন শুরু

চিকিৎসাটির ধারণাটি চমৎকার, যদিও প্রক্রিয়াটি মোটেই সহজ নয়।

প্রথমে রোগীর শরীর থেকে রক্তের স্টেম সেল সংগ্রহ করা হয়। এরপর বিশেষায়িত গবেষণাগারে সেই কোষের জিনগত নির্দেশনায় পরিবর্তন আনা হয়। পরে পরিবর্তিত কোষগুলো আবার রোগীর শরীরে ফিরিয়ে দেওয়া হয়।

এরপর শুরু হয় অপেক্ষা।

শরীরের ভেতর সেই কোষগুলো অস্থিমজ্জায় গিয়ে নতুন রক্তকণিকা তৈরির কাজ শুরু করে।

অর্থাৎ চিকিৎসাটি বাইরের কোনো অঙ্গ বসিয়ে দেওয়া নয়।

মানুষের নিজের কোষকেই নতুনভাবে কাজ করার সুযোগ দেওয়া।

এই জায়গাটিই জিন-চিকিৎসাকে এতটা আকর্ষণীয় করে তুলেছে।

—

সংখ্যার ভেতর লুকিয়ে আছে মানুষের গল্প

প্রাথমিক গবেষণার ফলও আশাব্যঞ্জক।

FDA-এর তথ্য অনুযায়ী, Casgevy-এর পরীক্ষায় পর্যাপ্ত সময় ধরে মূল্যায়ন করা ৩১ জন রোগীর মধ্যে ২৯ জন—প্রায় ৯৩ শতাংশ—অন্তত ১২ মাস গুরুতর vaso-occlusive crisis থেকে মুক্ত ছিলেন।

একজন গবেষকের কাছে এটি একটি গুরুত্বপূর্ণ পরিসংখ্যান।

কিন্তু একজন মায়ের কাছে এর অর্থ অন্যরকম।

এর অর্থ হতে পারে—

আরেকটি রাত হাসপাতালে কাটাতে হবে না।

আরেকটি জরুরি ফোন করতে হবে না।

আরেকবার সন্তানের ব্যথায় অসহায় হয়ে বসে থাকতে হবে না।

বিজ্ঞানের ভাষায় এগুলো ‘clinical outcomes’।

মানুষের ভাষায়—

স্বাভাবিক জীবন ফিরে পাওয়ার সম্ভাবনা।

—

সবচেয়ে ছোট রোগীদের জন্যও খুলছে দরজা

এই চিকিৎসার গল্পের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায় শুরু হয়েছে ২০২৬ সালে।

জুলাইয়ে FDA Casgevy-এর অনুমোদন দুই বছর বয়সী শিশু পর্যন্ত সম্প্রসারণ করেছে। ফলে গুরুতর সিকল সেল রোগে আক্রান্ত আরও কম বয়সী শিশুরাও এখন এই চিকিৎসার সম্ভাব্য প্রার্থী হতে পারে।

দুই বছর বয়সী একটি শিশু হয়তো এখনো জানে না ‘জিন’ কী।

সে জানে না ‘হিমোগ্লোবিন’ কী।

‘CRISPR’ শব্দটিও তার কাছে অর্থহীন।

কিন্তু সে জানে মায়ের কোলে থাকা ভালো।

সে জানে খেলতে ভালো লাগে।

আর সে জানে ব্যথা ভালো লাগে না।

বিজ্ঞানের সবচেয়ে বড় সৌন্দর্য হয়তো এখানেই—জটিলতম প্রযুক্তির শেষ লক্ষ্যটি কখনো কখনো খুব সরল:

একটি শিশুকে ব্যথামুক্ত শৈশব দেওয়া।

—

কিন্তু আশার সঙ্গে আছে কঠিন বাস্তবতা

এখানেই গল্পটির আরেকটি দিক সামনে আসে।

জিন-চিকিৎসা অসাধারণ—কিন্তু ব্যয়বহুল।

Casgevy-এর তালিকামূল্য প্রায় ২২ লাখ মার্কিন ডলার। Lyfgenia-এর ক্ষেত্রে তা প্রায় ৩১ লাখ ডলার।

তবে শুধু ওষুধের দামই বিষয় নয়।

এই চিকিৎসার আগে রোগীকে দীর্ঘ প্রস্তুতির মধ্য দিয়ে যেতে হয়। স্টেম সেল সংগ্রহ, উচ্চমাত্রার কেমোথেরাপি, পরিবর্তিত কোষ শরীরে ফিরিয়ে দেওয়া এবং এরপর দীর্ঘ পর্যবেক্ষণ—সব মিলিয়ে এটি একটি জটিল চিকিৎসাপ্রক্রিয়া।

কংগ্রেশনাল বাজেট অফিসের বিশ্লেষণ অনুযায়ী, পুরো প্রক্রিয়ায় কয়েক মাস সময় লাগতে পারে এবং রোগীকে দীর্ঘ সময় বিশেষায়িত চিকিৎসার আওতায় থাকতে হয়।

অর্থাৎ এটি এমন কোনো ওষুধ নয়, যা ফার্মেসি থেকে কিনে বাড়ি নিয়ে যাওয়া যায়।

এর জন্য প্রয়োজন—

অভিজ্ঞ চিকিৎসক,
বিশেষায়িত হাসপাতাল,
উন্নত ল্যাবরেটরি,
দীর্ঘমেয়াদি পরিচর্যা
এবং বিপুল অর্থের সংস্থান।

—

বিজ্ঞান যখন সবার জন্য নয়

এখানেই সবচেয়ে বড় প্রশ্নটি।

বিজ্ঞান যদি এত দূর এগিয়ে যায়, তবে তার সুফল সবার কাছে পৌঁছাবে তো?

একজন ধনী পরিবারের সন্তান যদি আধুনিক জিন-চিকিৎসার সুযোগ পায়, কিন্তু দরিদ্র পরিবারের সন্তান শুধু অর্থের অভাবে সেই সুযোগ থেকে বঞ্চিত হয়—তাহলে চিকিৎসাবিজ্ঞানের অগ্রগতি কি সম্পূর্ণ হলো?

আরেকটি প্রশ্নও আছে।

এই চিকিৎসা দেওয়ার মতো বিশেষায়িত কেন্দ্র পৃথিবীর সব দেশে নেই। অনেক রোগী হয়তো এমন জায়গায় বাস করেন, যেখান থেকে চিকিৎসার জন্য দূর শহরে যেতে হয়।

তাই জিন-চিকিৎসার সামনে এখন শুধু বৈজ্ঞানিক চ্যালেঞ্জ নেই।

আছে অর্থনৈতিক চ্যালেঞ্জ।

আছে স্বাস্থ্যব্যবস্থার চ্যালেঞ্জ।

আছে বৈশ্বিক বৈষম্যের প্রশ্ন।

ল্যাবরেটরিতে একটি জিন সম্পাদনা করা সম্ভব হয়েছে।

কিন্তু পৃথিবীর স্বাস্থ্যব্যবস্থার বৈষম্য সম্পাদনা করা এখনো সম্ভব হয়নি।

—

‘সুস্থ’ শব্দটির মূল্য কত?

চিকিৎসাবিজ্ঞানে সাফল্য মাপা হয় নানা সংখ্যায়।

কতজন রোগী সংকটমুক্ত হয়েছেন।
কতটা হিমোগ্লোবিন তৈরি হচ্ছে।
কতদিন জটিলতা দেখা দেয়নি।

কিন্তু একটি পরিবারের কাছে সাফল্যের মাপকাঠি হয়তো আরও সহজ।

সকালে শিশুটি ঘুম থেকে উঠে বলল—

‘মা, আজ স্কুলে যাব।’

মা একটু থেমে জিজ্ঞেস করলেন—

‘শরীর ভালো?’

শিশুটি বলল—

‘হ্যাঁ।’

ব্যস।

এর চেয়ে বড় কোনো ক্লিনিক্যাল ফলাফল হয়তো ওই মায়ের প্রয়োজন নেই।

—

ভবিষ্যৎ হয়তো আরও সহজ হবে

আজকের জিন-চিকিৎসা জটিল।
ব্যয়বহুল।
সময়-consuming।

কিন্তু চিকিৎসাবিজ্ঞানের ইতিহাস আমাদের একটি বিষয় শিখিয়েছে—

আজকের অসম্ভব
আগামী দিনের স্বাভাবিক চিকিৎসা হয়ে উঠতে পারে।

প্রযুক্তি উন্নত হলে খরচ কমতে পারে।
চিকিৎসার প্রক্রিয়া আরও সহজ হতে পারে।
আরও বেশি চিকিৎসাকেন্দ্র গড়ে উঠতে পারে।
আরও বেশি রোগী এর সুযোগ পেতে পারেন।

তবে সেই ভবিষ্যৎ নিশ্চিত করতে শুধু বিজ্ঞানীদের কাজ করলেই হবে না।

প্রয়োজন স্বাস্থ্যনীতি, অর্থায়ন, গবেষণা এবং এমন একটি ব্যবস্থা—যেখানে রোগীর আর্থিক অবস্থার চেয়ে তার প্রয়োজন বড় হয়ে ওঠে।

—

একদিন একটি শিশু দৌড়াবে

সন্ধ্যা নামছে।

মাঠে কয়েকটি শিশু খেলছে।

তাদের মধ্যে একজন একটু বেশি জোরে দৌড়াচ্ছে।

দূরে দাঁড়িয়ে থাকা মা বারবার বলছেন—

‘ধীরে! পড়ে যাবি!’

শিশুটি অবশ্য মায়ের কথা শুনছে না।

সে দৌড়াচ্ছে।

হাসছে।

তারপর হঠাৎ পেছন ফিরে চিৎকার করে বলল—

‘মা, দেখো!’

মা তাকিয়ে হাসলেন।

পৃথিবীর কাছে দৃশ্যটি খুব সাধারণ।

একটি শিশু খেলছে।

একজন মা তাকিয়ে আছেন।

কিন্তু এই সাধারণ দৃশ্যের পেছনে হয়তো রয়েছে বহু বছরের ব্যথা, হাসপাতালের রাত, উদ্বেগ, কান্না এবং অপেক্ষা।

আর রয়েছে মানুষের একটি অদম্য প্রশ্ন—

‘আমরা কি রোগটাকেই বদলে দিতে পারি?’

সেই প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে গিয়ে মানুষ আজ নিজের জিনের দরজায় পৌঁছে গেছে।

দরজাটি এখনো পুরোপুরি খোলেনি।

তবু ভেতর থেকে আলো দেখা যাচ্ছে।

সেই আলোয় একটি শিশু দৌড়াচ্ছে।

ব্যথা থেকে দূরে।

হাসপাতাল থেকে দূরে।

ভয়ের থেকেও দূরে।

দৌড়াচ্ছে একটি খুব সাধারণ বিকেলের দিকে।

আর সেই সাধারণ বিকেলই হয়তো তার জীবনের সবচেয়ে বড় অলৌকিক ঘটনা।

কারণ সুস্থভাবে বেঁচে থাকার চেয়ে বড় আবিষ্কার আর কী হতে পারে?

Leave a Comment