
২০১৬ সালের কানাডা সফরে হজরত মির্জা মসরুর আহমদ যে প্রশ্নগুলো সামনে এনেছিলেন—শান্তি, ন্যায়বিচার, ধর্মীয় স্বাধীনতা ও মানবিক মর্যাদার সেই বার্তা আজও কেন প্রাসঙ্গিক
সাঈফুল ইসলাম
কখনো কখনো একজন ধর্মীয় নেতা পার্লামেন্টে প্রবেশ করেন, আর মুহূর্তেই আলোচনার পরিসর বদলে যায়। সেখানে আর শুধু রাজনীতি থাকে না; সামনে চলে আসে মানুষের বিবেক, ন্যায়বিচার, স্বাধীনতা এবং ভবিষ্যৎ পৃথিবীর প্রশ্ন।
২০১৬ সালের ১৭ অক্টোবর কানাডার রাজধানী অটোয়ার পার্লামেন্ট হিলে এমনই এক মুহূর্তের সাক্ষী হয়েছিল দেশটি।
হজরত মির্জা মসরুর আহমদ, খলিফাতুল মসীহ পঞ্চম ও আহমদিয়া মুসলিম জামাতের আধ্যাত্মিক নেতা, সেদিন তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী জাস্টিন ট্রুডোর সঙ্গে সাক্ষাৎ করেন। তিনি কানাডা সরকারের জ্যেষ্ঠ মন্ত্রী, সিনেটর ও সংসদ সদস্যদের সঙ্গেও মতবিনিময় করেন। পরে হাউস অব কমন্সের প্রশ্নোত্তর পর্বে তাঁকে আনুষ্ঠানিকভাবে পরিচয় করিয়ে দেওয়া হলে বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের সদস্যরা দাঁড়িয়ে তাঁকে অভ্যর্থনা জানান।
দৃশ্যটি ছিল তাৎপর্যপূর্ণ।
তবে সেই করতালিই ছিল না দিনের মূল ঘটনা।
মূল বিষয় ছিল—করতালি থেমে যাওয়ার পর যে প্রশ্নগুলো সামনে এল।
সেদিন সন্ধ্যায় স্যার জন এ ম্যাকডোনাল্ড ভবনে আয়োজিত এক অনুষ্ঠানে ২২৫ জনের বেশি মানুষ অংশ নেন। তাঁদের মধ্যে ছিলেন ৫০ জনের বেশি সংসদ সদস্য, মন্ত্রী, ১১টি দেশের কূটনীতিক, শিক্ষাবিদ এবং নাগরিক সমাজের প্রতিনিধিরা।
সেখানে হজরত মির্জা মসরুর আহমদ বক্তব্য দেন ‘Human Values—The Foundation for a Peaceful World’ বা ‘মানবিক মূল্যবোধ—শান্তিপূর্ণ বিশ্বের ভিত্তি’ শিরোনামে।
বক্তব্যের শিরোনামটি ছিল সংক্ষিপ্ত। কিন্তু এর অন্তর্নিহিত প্রশ্ন ছিল গভীর:
প্রযুক্তি যখন পৃথিবীকে অভূতপূর্বভাবে কাছে এনে দিয়েছে, তখন মানুষের হৃদয় কেন এখনো বিভাজনের দেয়ালে আটকে আছে?
এক পৃথিবী, অথচ এত বিভাজন
আধুনিক সভ্যতা দূরত্বকে অনেকটাই জয় করেছে।
বিমান কয়েক ঘণ্টায় মহাদেশ পাড়ি দেয়। একটি বার্তা কয়েক সেকেন্ডে পৌঁছে যায় পৃথিবীর অন্য প্রান্তে। এক দেশের অর্থনৈতিক সিদ্ধান্তের প্রভাব মুহূর্তেই পড়তে পারে অন্য দেশের মানুষের জীবনে।
কিন্তু যোগাযোগ বাড়লেই বোঝাপড়া বাড়ে না।
ধর্ম, জাতীয়তাবাদ, রাজনৈতিক মতাদর্শ, অর্থনৈতিক বৈষম্য ও নিরাপত্তাহীনতা এখনো মানুষকে বিভক্ত করে।
হজরত মির্জা মসরুর আহমদের বক্তব্যে আধুনিক সভ্যতার এই বৈপরীত্যটি বিশেষভাবে উঠে আসে। প্রযুক্তি মানুষকে কাছে এনেছে, কিন্তু মানবিক মূল্যবোধের অভাব সেই একই প্রযুক্তিকে কখনো বিভাজন ও সংঘাতের বাহনে পরিণত করতে পারে।
একটি স্থানীয় অন্যায় আন্তর্জাতিক ক্ষোভের জন্ম দিতে পারে। অর্থনৈতিক বৈষম্য রাজনৈতিক অস্থিরতা তৈরি করতে পারে। একটি সামরিক সংঘাতের অভিঘাত ছড়িয়ে পড়তে পারে হাজার হাজার কিলোমিটার দূরে।
পৃথিবী যেন একটি বিশাল পাড়ায় পরিণত হয়েছে।
কিন্তু একই পাড়ায় শান্তিপূর্ণভাবে বসবাসের নৈতিক শিক্ষা কি আমরা সত্যিই আয়ত্ত করতে পেরেছি?
ধর্মীয় স্বাধীনতা: রাষ্ট্রের সীমা কোথায়?
গণতান্ত্রিক সমাজের সামনে একটি মৌলিক প্রশ্ন হলো—একজন মানুষের ব্যক্তিগত বিশ্বাস ও জীবনে রাষ্ট্রের হস্তক্ষেপের সীমা কোথায়?
হজরত মির্জা মসরুর আহমদ কোরআনের স্বাধীন বিবেকের নীতির আলোকে ধর্মীয় স্বাধীনতার গুরুত্ব তুলে ধরেন। মানুষের বিশ্বাস, ধর্মীয় অনুশীলন, পোশাক এবং উপাসনার স্থান—এসব বিষয়ে অপ্রয়োজনীয় রাষ্ট্রীয় হস্তক্ষেপের বিরোধিতা করেন তিনি।
তবে স্বাধীনতার সঙ্গে দায়িত্বের সম্পর্কও তিনি স্পষ্ট করেন।
ধর্মীয় স্বাধীনতা সহিংসতার স্বাধীনতা নয়।
কোনো ব্যক্তি বা সংগঠন যদি সহিংসতা, ঘৃণা কিংবা উগ্রবাদকে উৎসাহিত করে, তখন রাষ্ট্রের দায়িত্ব রয়েছে তা প্রতিহত করার।
অর্থাৎ একটি শান্তিপূর্ণ রাষ্ট্র মানুষের বিবেক নিয়ন্ত্রণ করবে না; বরং এমন একটি পরিবেশ নিশ্চিত করবে, যেখানে মানুষ স্বাধীনভাবে বিশ্বাস ও ধর্ম পালন করতে পারে এবং একই সঙ্গে সহিংসতা ও ঘৃণার বিরুদ্ধে আইন কার্যকর থাকে।
এটি শুধু ধর্মীয় স্বাধীনতার প্রশ্ন নয়। এটি গণতন্ত্রেরও একটি মৌলিক পরীক্ষা।
একটি অস্ত্রের প্রকৃত মূল্য কত?
যুদ্ধের প্রসঙ্গে প্রশ্নটি আরও কঠিন।
একটি অস্ত্র বিক্রি করে একটি রাষ্ট্র কত অর্থ আয় করতে পারে? আর সেই অস্ত্রের ব্যবহারে একটি পরিবার বাস্তুচ্যুত হলে, একটি হাসপাতাল ধ্বংস হলে কিংবা একটি শিশুর শৈশব হারিয়ে গেলে তার মূল্য কত?
অটোয়ার বক্তব্যে হজরত মির্জা মসরুর আহমদ ইয়েমেনের যুদ্ধ এবং সংঘাতপূর্ণ অঞ্চলে পশ্চিমা অস্ত্র সরবরাহের প্রসঙ্গ তুলে ধরেন।
তাঁর বক্তব্যের কেন্দ্রে ছিল একটি মানবিক হিসাব।
অস্ত্রের বাণিজ্য থেকে যে অর্থনৈতিক লাভ আসে, যুদ্ধের কারণে সৃষ্ট মানবিক, সামাজিক ও নিরাপত্তাগত ক্ষতি কি তার চেয়ে বহুগুণ বেশি নয়?
একটি ধ্বংসপ্রাপ্ত বিদ্যালয়ের মূল্য কত?
একটি বিধ্বস্ত হাসপাতালের?
একটি বাস্তুচ্যুত পরিবারের?
যুদ্ধের মধ্যে বেড়ে ওঠা একটি শিশুর ভবিষ্যতের?
সহিংসতা ও হতাশার পরিবেশে বেড়ে ওঠা একটি প্রজন্মের?
যুদ্ধের অভিঘাত যুদ্ধক্ষেত্রেই শেষ হয়—এ ধারণা ইতিহাস বারবার ভুল প্রমাণ করেছে।
সংঘাতের সঙ্গে আসে শরণার্থী সংকট, রাজনৈতিক অস্থিরতা, সন্ত্রাসবাদ, সামাজিক মেরুকরণ ও দীর্ঘস্থায়ী নিরাপত্তাহীনতা।
যুদ্ধ হয়তো শুরু হয় দূরের কোনো ভূখণ্ডে।
কিন্তু তার প্রতিধ্বনি এসে পৌঁছাতে পারে নিজের ঘরের দরজায়।
জাতিসংঘ ও আন্তর্জাতিক ন্যায়বিচারের প্রশ্ন
অটোয়ার বক্তব্যে আলোচনার পরিসর জাতীয় রাজনীতির গণ্ডি পেরিয়ে আন্তর্জাতিক ব্যবস্থায় পৌঁছে যায়।
হজরত মির্জা মসরুর আহমদের মতে, আন্তর্জাতিক ন্যায়বিচার যদি ধারাবাহিক ও নিরপেক্ষভাবে প্রয়োগ করা না হয়, তাহলে বৈশ্বিক প্রতিষ্ঠানগুলোর প্রতি মানুষের আস্থা দুর্বল হয়ে পড়ে।
জাতীয় স্বার্থ, রাজনৈতিক পক্ষপাত এবং পরাশক্তিগুলোর পারস্পরিক বিরোধ আন্তর্জাতিক প্রতিষ্ঠানগুলোর কার্যকারিতাকে সীমিত করতে পারে।
তাঁর সতর্কবার্তার সারকথা ছিল স্পষ্ট:
ন্যায়বিচার যদি নির্বাচিতভাবে প্রয়োগ করা হয়, শান্তিও দীর্ঘস্থায়ী হতে পারে না।
আর পারমাণবিক অস্ত্রে সজ্জিত পৃথিবীতে কোনো আঞ্চলিক সংঘাতকেই তুচ্ছ করে দেখার সুযোগ নেই।
একটি ছোট সংঘাতও ভুল সিদ্ধান্ত, প্রতিশোধ কিংবা ভুল হিসাবের ধারাবাহিকতায় বৃহত্তর বিপর্যয়ের দিকে যেতে পারে।
তাই শান্তির জন্য শুধু কূটনীতি যথেষ্ট নয়।
প্রয়োজন ন্যায়বিচারের ভিত্তি।
পার্লামেন্ট থেকে বিশ্ববিদ্যালয়ে
অটোয়ার রাজনৈতিক পরিসরের পর একই বার্তা পৌঁছে যায় বিশ্ববিদ্যালয়ের অঙ্গনেও।
২৮ অক্টোবর টরন্টোর ইয়র্ক ইউনিভার্সিটিতে হজরত মির্জা মসরুর আহমদ ‘Justice in an Unjust World’ বা ‘একটি অন্যায় পৃথিবীতে ন্যায়বিচার’ শিরোনামে বক্তব্য দেন।
এবার শ্রোতাদের বড় অংশ ছিলেন শিক্ষাবিদ ও বুদ্ধিজীবী।
কিন্তু মূল প্রশ্নটি ছিল একই:
জ্ঞান কি শুধু জানার জন্য, নাকি মানুষের জীবন বদলানোর জন্যও?
অর্থনৈতিক বৈষম্য, বৈশ্বিক বাণিজ্য এবং সম্পদের অসম বণ্টনের মতো বিষয় নিয়ে তিনি আলোচনার আহ্বান জানান।
একটি বিশ্ববিদ্যালয় যদি শুধু সমাজের সমস্যাগুলো শনাক্ত করে, সেটিই কি তার শেষ দায়িত্ব?
নাকি জ্ঞানের প্রকৃত সার্থকতা তখনই, যখন তা সমস্যার সমাধানের পথ দেখাতে পারে?
প্রশ্নটি আজও সমান প্রাসঙ্গিক।
শান্তির সেতু কোথা থেকে তৈরি হয়?
কানাডায় আহমদিয়া মুসলিম জামাতের আয়োজিত প্রথম ন্যাশনাল পিস সিম্পোজিয়ামেও উঠে আসে শান্তি প্রতিষ্ঠার এই দর্শন।
ভন শহরের বায়তুল ইসলাম মসজিদে আয়োজিত অনুষ্ঠানে ৬০০ জনের বেশি মানুষ অংশ নেন। উপস্থিত ছিলেন রাজনৈতিক ও নাগরিক সমাজের প্রতিনিধিরাও।
সেখানে শান্তির ভিত্তি হিসেবে উঠে আসে একটি সহজ অথচ গভীর নীতি:
আপনি নিজের জন্য যা কামনা করেন, অন্যের জন্যও তা কামনা করুন।
ব্যক্তিজীবনে নীতিটি সহজ মনে হতে পারে। কিন্তু রাষ্ট্রীয় সম্পর্কের ক্ষেত্রে এর প্রয়োগ অত্যন্ত কঠিন।
যদি এই নীতি প্রতিবেশী থেকে রাষ্ট্র, ব্যক্তি থেকে সমাজ, কিংবা এক ধর্ম থেকে অন্য ধর্মের সম্পর্কেও প্রয়োগ করা যেত, তাহলে পৃথিবীর রাজনৈতিক ও সামাজিক বাস্তবতা হয়তো অনেকটাই ভিন্ন হতো।
শান্তির বড় বড় তত্ত্বের পাশাপাশি কখনো কখনো প্রয়োজন হয় একটি সহজ নৈতিক বোধের।
শরণার্থী শুধু একটি সংখ্যা নন
কানাডা সফরের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ প্রসঙ্গ ছিল শরণার্থী সংকট।
কানাডার মানবিক উদ্যোগের প্রশংসার পাশাপাশি হজরত মির্জা মসরুর আহমদ শরণার্থীদের সমাজে কার্যকরভাবে একীভূত করার প্রয়োজনীয়তার ওপর গুরুত্ব দেন।
শুধু আশ্রয় দিলেই দায়িত্ব শেষ হয় না।
একজন শরণার্থীর প্রয়োজন নিরাপত্তার পাশাপাশি মর্যাদা।
প্রয়োজন একটি ঘরের পাশাপাশি নতুন জীবনের উদ্দেশ্য।
প্রয়োজন সহায়তার পাশাপাশি নিজের পায়ে দাঁড়ানোর সুযোগ।
কাজ, শিক্ষা ও সামাজিক অংশগ্রহণ একজন মানুষকে নতুন সমাজে শুধু টিকে থাকতে নয়, অবদান রাখতেও সক্ষম করে।
মানবিকতা তাই শুধু দরজা খুলে দেওয়ার নাম নয়।
দরজা দিয়ে প্রবেশ করা মানুষটিকে সমাজের অংশ হয়ে ওঠার সুযোগ দেওয়াও মানবিকতার অংশ।
রাজনীতির ভাষা যখন ভয় তৈরি করে
কানাডা সফরের শেষ পর্যায়টি ঘটে ২০১৬ সালের মার্কিন প্রেসিডেন্ট নির্বাচনকে ঘিরে উত্তাল রাজনৈতিক পরিবেশে।
পশ্চিম কানাডায় হজরত মির্জা মসরুর আহমদকে ডোনাল্ড ট্রাম্পের প্রচারণায় মুসলিম অভিবাসন নিয়ে দেওয়া বক্তব্য সম্পর্কে প্রশ্ন করা হয়।
তাঁর প্রতিক্রিয়ায় আতঙ্ক ছড়ানোর বদলে ছিল স্থিরতার আহ্বান।
তিনি মুসলমানদের আতঙ্কিত না হওয়ার পরামর্শ দেন এবং মনে করেন, রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠান, সাংবিধানিক ভারসাম্য ও বাস্তব শাসনব্যবস্থার কারণে নির্বাচনী প্রচারণার অনেক বক্তব্য বাস্তব নীতিতে একইভাবে প্রতিফলিত নাও হতে পারে।
তবে একই সঙ্গে তিনি সতর্ক করেন—বৈষম্যমূলক নীতি বাস্তবে প্রয়োগ করা হলে তা সামাজিক বিভাজন ও অভ্যন্তরীণ অস্থিরতা বাড়াতে পারে।
এখানে তাঁর অবস্থান ছিল না আতঙ্কের, আবার আত্মতুষ্টিরও নয়।
ছিল বাস্তবতাকে বৃহত্তর প্রেক্ষাপটে দেখার আহ্বান।
কারণ রাজনৈতিক বক্তব্য এক দিনে বদলে যেতে পারে।
কিন্তু ঘৃণা ও বিভাজনের ক্ষত সারতে কখনো কখনো প্রজন্ম লেগে যায়।
রাজনীতির বাইরে এক ধরনের ধর্মীয় নেতৃত্ব
২০১৬ সালের কানাডা সফরের দিকে ফিরে তাকালে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হয়তো কোনো একটি সাক্ষাৎ বা বক্তৃতা নয়।
বরং বিভিন্ন আয়োজনের মধ্যে যে অভিন্ন সুরটি বারবার ফিরে এসেছে, সেটিই সবচেয়ে তাৎপর্যপূর্ণ।
পার্লামেন্ট।
বিশ্ববিদ্যালয়।
মসজিদ।
কূটনৈতিক মহল।
নাগরিক সমাজ।
গণমাধ্যম।
শ্রোতা বদলেছে, পরিবেশ বদলেছে; কিন্তু আলোচনার কেন্দ্রে ফিরে এসেছে একই মূল্যবোধ—
ন্যায়বিচার, ধর্মীয় স্বাধীনতা, মানবিক মর্যাদা, অর্থনৈতিক সাম্য ও শান্তি।
এখানে ধর্মীয় নেতৃত্বের একটি ভিন্নতর রূপ দেখা যায়।
রাজনৈতিক ক্ষমতা অর্জনের আকাঙ্ক্ষা নয়; বরং রাজনীতির সামনে নৈতিক প্রশ্ন তুলে ধরা।
রাজনীতিবিদকে প্রশ্ন করা—নির্বাচনের পরের পৃথিবীটি কেমন হবে?
অর্থনীতিবিদকে প্রশ্ন করা—লাভের হিসাবের বাইরে মানুষের মূল্য কোথায়?
শিক্ষাবিদকে প্রশ্ন করা—জ্ঞান কি মানুষের জীবন বদলাচ্ছে?
সাংবাদিককে প্রশ্ন করা—তথ্য পরিবেশনের সঙ্গে দায়িত্বও কি সমান গুরুত্বপূর্ণ নয়?
আর সাধারণ মানুষকে প্রশ্ন করা—অন্য ধর্ম, অন্য জাতি কিংবা অন্য দেশের মানুষকে আমরা কেন ‘অপর’ হিসেবে দেখব?
শান্তির কাজ এখনো শেষ হয়নি
শেষ পর্যন্ত ২০১৬ সালের কানাডা সফরের সবচেয়ে বড় শিক্ষা কোনো একটি বক্তৃতার বাক্যে সীমাবদ্ধ নয়।
শান্তি শুধু বক্তৃতায় প্রতিষ্ঠিত হয় না।
শান্তি তৈরি হয় প্রতিদিনের সিদ্ধান্তে।
একটি সরকার সিদ্ধান্ত নেয়—ন্যায়বিচার সবার জন্য সমান হবে কি না।
একটি সংসদ সিদ্ধান্ত নেয়—সংখ্যালঘু মানুষের অধিকার কতটা সুরক্ষিত থাকবে।
একটি রাষ্ট্র সিদ্ধান্ত নেয়—পররাষ্ট্রনীতিতে মানবজীবন নাকি অর্থনৈতিক স্বার্থ অগ্রাধিকার পাবে।
একটি সমাজ সিদ্ধান্ত নেয়—শরণার্থীকে বহিরাগত হিসেবে দেখবে, নাকি প্রতিবেশী হিসেবে গ্রহণ করবে।
আর একজন মানুষ সিদ্ধান্ত নেন—ভয় তাঁকে ঘৃণার দিকে নিয়ে যাবে, নাকি অজানাকে জানার আগ্রহ তৈরি করবে।
এই কারণেই কানাডা সফরের ঘটনাগুলো শুধু ২০১৬ সালের একটি অধ্যায় নয়। এগুলো আজকের পৃথিবীরও প্রশ্ন।
কারণ প্রযুক্তি আমাদের অভূতপূর্ব ক্ষমতা দিয়েছে। কিন্তু সেই ক্ষমতা কীভাবে ব্যবহার করব, তার উত্তর এখনো মানুষের নৈতিকতার ওপর নির্ভরশীল।
পৃথিবী ছোট হয়ে এসেছে।
কিন্তু মানবিক দায়িত্ব কি একই সঙ্গে বড় হয়েছে?
প্রশ্নটি এখনো খোলা।
আর হয়তো এর উত্তর খুঁজতে হলে আমাদের ফিরে যেতে হবে একটি সহজ শব্দের কাছে—
মানবিক মূল্যবোধ।
কারণ ইতিহাস বারবার দেখিয়েছে, ক্ষমতা যখন প্রজ্ঞার চেয়ে দ্রুত এগিয়ে যায়, তখন বিপদের শুরু হয়।
আগামী পৃথিবী কেমন হবে, তা প্রযুক্তি একা নির্ধারণ করবে না।
নির্ধারণ করবে মানুষ।
আর মানুষের সবচেয়ে বড় পরীক্ষা হয়তো এখানেই—
আমাদের ক্ষমতা যত দ্রুত বাড়ছে, আমাদের বিবেক কি তার সঙ্গে তাল মিলিয়ে এগোচ্ছে?