
হযরত মির্যা মসরূর আহমদ (আই.)-এর জুমার খুতবা থেকে কৃতজ্ঞতার ৫টি বৈপ্লবিক শিক্ষা
কল্পনা করুন, সামনে রাজকীয় ভোজ সাজানো। টেবিলজুড়ে নানা রকম খাবার, সুগন্ধ, রং ও স্বাদ। অথচ ভোজের মালিকের চোখ আটকে আছে এক জায়গায়—লবণটা একটু কম।
মানুষের মন কখনো কখনো এমনই।
যা আছে, তার হিসাব না করে যা নেই, তার তালিকা বানাতে আমরা বেশি ব্যস্ত। সুস্থ শরীর, সচল মস্তিষ্ক, পরিবার, খাদ্য, নিরাপত্তা, ভালোবাসা—সবকিছু যেন স্বাভাবিক। আর সামান্য একটি অপূর্ণতা আমাদের সমস্ত প্রাপ্তিকে ঢেকে দেয়।
২১ আগস্ট ২০২৬ তারিখে এমটিএ ইন্টারন্যাশনালের মাধ্যমে প্রচারিত জুমার খুতবায় হযরত মির্যা মসরূর আহমদ (আই.) কৃতজ্ঞতার বিষয়টিকে এই পরিচিত নৈতিকতার গণ্ডি পেরিয়ে এক গভীর আধ্যাত্মিক প্রশ্নে পরিণত করেছেন। হযরত মসীহ মাওউদ (আ.)-এর জীবন ও শিক্ষা সামনে রেখে তিনি যেন প্রশ্ন তুলেছেন: আমরা কি শুধু ‘আলহামদুলিল্লাহ’ বলি, নাকি আমাদের জীবনও সেই কথার সাক্ষ্য দেয়?
তাঁর আলোচনায় কৃতজ্ঞতা কোনো আনুষ্ঠানিক সৌজন্য নয়। এটি স্রষ্টার সঙ্গে মানুষের সম্পর্কের একটি মৌলিক পরীক্ষা—এক ধরনের আধ্যাত্মিক ‘নমক হালালি’।
১. সুস্থ মস্তিষ্ক—যে নেয়ামতটির মূল্য আমরা ভুলে যাই
আমরা সাধারণত নেয়ামত বলতে অর্থ, বাড়ি, গাড়ি কিংবা আরামকে বুঝি। কিন্তু হযরত মসীহ মাওউদ (আ.)-এর আলোচনায় একটি আরও মৌলিক নেয়ামত সামনে আসে—সুস্থ বুদ্ধি ও চেতনা।
মানুষের মস্তিষ্ক শুধু তথ্য গ্রহণের যন্ত্র নয়। এর মাধ্যমে মানুষ ভালো-মন্দ বিচার করে, সৌন্দর্য উপলব্ধি করে, ভালোবাসে, কাঁদে, প্রার্থনা করে এবং নিজের স্রষ্টাকে চিনতে চেষ্টা করে।
এই জায়গাতেই মানসিকভাবে অক্ষম মানুষের প্রসঙ্গটি আমাদের সামনে একটি অস্বস্তিকর আয়না ধরে।
কেউ যদি স্বাভাবিকভাবে চিন্তা করার ক্ষমতাই না পায়, সে কীভাবে জীবনের অর্থ উপলব্ধি করবে? কীভাবে ইবাদতের মাধুর্য অনুভব করবে? কীভাবে নিজের স্রষ্টার পরিচয় অনুসন্ধান করবে?
প্রশ্নটি তাই অন্যদের নিয়ে নয়। প্রশ্নটি আমাদের নিয়ে।
যে মানুষটি সুস্থ মস্তিষ্ক পেয়েও স্রষ্টাকে ভুলে থাকে, তার অক্ষমতা কোথায়?
আমরা হয়তো অভিযোগ করি—জীবনে এটি নেই, সেটি নেই। অথচ আমাদের হাতে এমন একটি নেয়ামত রয়েছে, যার প্রকৃত মূল্য উপলব্ধি করাই কঠিন।
কৃতজ্ঞতার প্রথম শিক্ষা তাই সম্ভবত খুব সরল:
অভিযোগ করার আগে গণনা করুন—আপনার কাছে ইতিমধ্যে কত কিছু আছে।
২. বিশ টাকার নর্তকী এবং ‘নমক হালালি’র কঠিন প্রশ্ন
কৃতজ্ঞতার অর্থ বোঝাতে হযরত মসীহ মাওউদ (আ.) যে ঘটনাটি উল্লেখ করেছেন, তার শক্তি আজও অস্বস্তিকরভাবে তীব্র।
একজন নর্তকী মাত্র ২০ টাকার বিনিময়ে সারারাত জেগে নাচগান করেছিল। ঘটনাটি দেখে তাঁর মনে যে প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি হয়েছিল, তার মর্ম ছিল গভীর আক্ষেপ—সামান্য পার্থিব পারিশ্রমিকের জন্যও মানুষ কতটা নিষ্ঠা দেখাতে পারে!
এখানেই ‘নমক হালালি’র ধারণাটি নতুন অর্থ পায়।
যে মানুষ সামান্য পারিশ্রমিকের জন্য নিজের ঘুম, আরাম ও সময় বিসর্জন দিতে পারে, সে কি তার প্রকৃত মালিকের জন্য সামান্য সময় দিতে পারে না?
প্রশ্নটি ঘুমের নয়। প্রশ্নটি অগ্রাধিকারের।
আমরা বলি, সময় নেই।
কিন্তু কয়েক ঘণ্টা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে কাটে। বিনোদনের জন্য সময় থাকে। কাজের জন্য সময় থাকে। বন্ধুদের জন্য সময় থাকে। তাহলে স্রষ্টার জন্য সময় কোথায়?
এখানেই কৃতজ্ঞতা আবেগ থেকে দায়িত্বে পরিণত হয়।
যার নেয়ামত আমরা প্রতিদিন ভোগ করছি, তাঁর জন্য আমাদের জীবনে কি সত্যিই কোনো নির্দিষ্ট জায়গা আছে?
৩. তাওয়াক্কুল মানে কারণকে অস্বীকার করা নয়
ধর্মীয় জীবনে একটি প্রচলিত ভুল ধারণা হলো—আল্লাহর ওপর ভরসা করতে হলে জাগতিক উপায় গ্রহণ করা যাবে না।
হযরত মসীহ মাওউদ (আ.)-এর শিক্ষা এই ধারণার বিপরীত একটি ভারসাম্যপূর্ণ পথ দেখায়।
প্লেগের সময় তিনি শুধু দোয়ার ওপর নির্ভর করেননি; পরিচ্ছন্নতা বজায় রাখা, পরিবেশ পরিষ্কার রাখা এবং জীবাণুনাশক ব্যবহারের মতো বাস্তব পদক্ষেপের কথাও বলেছেন।
এখানে একটি গুরুত্বপূর্ণ নীতি আছে:
দোয়া এবং চেষ্টা পরস্পরের প্রতিদ্বন্দ্বী নয়।
বরং আল্লাহ প্রকৃতিতে যে নিয়ম ও উপায় সৃষ্টি করেছেন, সেগুলো ব্যবহার করাও তাঁর নেয়ামতের স্বীকৃতি।
বিজ্ঞান তাই বিশ্বাসের শত্রু নয়। সঠিক দৃষ্টিভঙ্গিতে বিজ্ঞান হতে পারে সৃষ্টিজগতের নিয়মকে বোঝার একটি মাধ্যম।
অসুস্থ হলে চিকিৎসা নেওয়া, বিপদে সতর্ক হওয়া, রোগ প্রতিরোধে বৈজ্ঞানিক পদ্ধতি অনুসরণ করা—এসব আল্লাহর ওপর ভরসার বিপরীত নয়। বরং এগুলো সেই সৃষ্টিশীল ব্যবস্থার প্রতি সম্মান, যার মাধ্যমে মানুষকে কারণ অনুসন্ধান ও উপায় গ্রহণের ক্ষমতা দেওয়া হয়েছে।
কৃতজ্ঞ মানুষ তাই শুধু আকাশের দিকে তাকায় না।
সে পৃথিবীর নিয়মও পড়ে।
৪. খাবারের টেবিলেও আধ্যাত্মিকতা আছে
আমাদের জীবনে সবচেয়ে সাধারণ দৃশ্যগুলোর একটি—খাওয়া।
কিন্তু হযরত মসীহ মাওউদ (আ.)-এর জীবনে খাবার ছিল কেবল ক্ষুধা নিবারণের বিষয় নয়; এটি ছিল কৃতজ্ঞতার একটি মুহূর্ত।
বর্ণনাগুলোতে তাঁর ধীরস্থিরভাবে খাবার গ্রহণের কথা পাওয়া যায়। প্রতিটি লোকমা যেন ছিল সচেতনতার সঙ্গে গ্রহণ করা একটি নেয়ামত।
এখানে আধুনিক মানুষের জন্য একটি অদ্ভুত শিক্ষা আছে।
আমরা খাবার খাই, কিন্তু খাবারের দিকে তাকাই না।
আমরা পরিবারের সঙ্গে বসি, কিন্তু পরিবারের উপস্থিতি অনুভব করি না।
আমরা পৃথিবীর সৌন্দর্য দেখি, কিন্তু সৌন্দর্যের উৎস নিয়ে ভাবি না।
আমরা পানি পান করি, কিন্তু এক গ্লাস পানির পেছনে থাকা অসংখ্য প্রাকৃতিক প্রক্রিয়ার কথা মনে করি না।
অর্থাৎ আমাদের জীবন নেয়ামতে পরিপূর্ণ, কিন্তু সচেতনতা সংকুচিত।
কৃতজ্ঞতা সেই সচেতনতার নাম—যেখানে একটি সাধারণ লোকমাও মানুষকে তার স্রষ্টার কথা মনে করিয়ে দেয়।
৫. মানুষের প্রতি কৃতজ্ঞতা—কারণ আল্লাহর শুকরিয়া মানুষকে বাদ দিয়ে সম্পূর্ণ হয় না
কৃতজ্ঞতার সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ পরীক্ষাগুলোর একটি হলো—আমরা অন্য মানুষের উপকার কতটা মনে রাখি।
হযরত মসীহ মাওউদ (আ.)-এর জীবন এ ক্ষেত্রে অসাধারণ দৃষ্টান্তে পূর্ণ।
যাঁরা তাঁর লেখালেখি, প্রকাশনা কিংবা দৈনন্দিন কাজে সহযোগিতা করেছেন, তাঁদের অবদান তিনি ভুলে যাননি। মিয়া মনজুর মোহাম্মদের মতো সহযোগীদের নিষ্ঠার কথা তিনি কৃতজ্ঞতার সঙ্গে স্মরণ করেছেন।
বাটলায় সফরের সময় যাঁরা তাঁর সেবা করেছিলেন, তাঁদের প্রতিও তিনি কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করেছেন। এমনকি অতি সামান্য অর্থ দিয়ে তাঁর ধর্মীয় প্রচেষ্টায় সহযোগিতা করা ব্যক্তিদের অবদানও তিনি স্মরণে রেখেছেন।
এই দৃষ্টিভঙ্গির মধ্যে একটি বড় শিক্ষা লুকিয়ে আছে:
উপকারের মূল্য তার পরিমাণে নয়; উপকারের মূল্য আন্তরিকতায়।
একজন মানুষ হয়তো আপনাকে এক কোটি টাকা দেয়নি। হয়তো শুধু এক গ্লাস পানি এগিয়ে দিয়েছে।
কিন্তু সেই এক গ্লাস পানির মুহূর্তে যদি আপনার প্রয়োজন ছিল, তবে তার মূল্য আপনার কাছে কত?
কৃতজ্ঞ হৃদয় হিসাব করে না—‘কত পেয়েছি?’
সে মনে রাখে—‘কে আমার পাশে দাঁড়িয়েছিল?’
কৃতজ্ঞতার শেষ পরীক্ষা: আমরা কি জেগে আছি?
এই পুরো আলোচনার সবচেয়ে শক্তিশালী প্রশ্নটি হয়তো এখানেই।
হযরত ঈসা (আ.)-এর শিষ্যদের একটি সময়ের ঘুমিয়ে পড়ার ঘটনা এবং মসীহ মুহাম্মদী (সা.)-এর সাহাবিদের নিষ্ঠার উদাহরণ সামনে এনে আমাদের একটি গভীর নৈতিক পার্থক্যের দিকে তাকাতে বলা হয়।
মিয়া আব্দুল আজিজের মতো নিবেদিতপ্রাণ সঙ্গীদের সম্পর্কে যে চিত্র পাওয়া যায়, সেখানে দায়িত্ববোধ এত গভীর যে তাঁরা সেবার সুযোগ হারাতে চাইতেন না। তাঁরা যেন বলতেন—আমার মাওলার কখন কী প্রয়োজন হয়, আমি কীভাবে নিশ্চিন্তে ঘুমাই?
এটি নিছক আনুগত্যের গল্প নয়।
এটি কৃতজ্ঞতার গল্প।
কারণ প্রকৃত কৃতজ্ঞতা মানুষকে সক্রিয় করে।
যে সত্যিই কৃতজ্ঞ, সে শুধু বলে না—সে করে।
সে সময় দেয়।
সে ত্যাগ করে।
সে সেবা করে।
সে স্মরণ করে।
সে অন্যের উপকারের প্রতিদান দিতে চেষ্টা করে।
শেষ কথা
আমাদের সময়ের সবচেয়ে বড় সমস্যা হয়তো অকৃতজ্ঞতা নয়—অকৃতজ্ঞতার প্রতি অসচেতনতা।
আমরা জানিই না যে আমরা অকৃতজ্ঞ।
আমরা অভিযোগকে স্বাভাবিক ভাবি। প্রাপ্তিকে অধিকার মনে করি। আর অনুগ্রহকে দৈনন্দিন জীবনের স্বাভাবিক ঘটনা বলে ধরে নিই।
হযরত মির্যা মসরূর আহমদ (আই.)-এর এই খুতবার শিক্ষা সেই অভ্যাসে একটি প্রশ্নচিহ্ন বসায়।
সুস্থ মস্তিষ্ক পেয়েছি—আমি তা কী কাজে ব্যবহার করছি?
সময় পেয়েছি—কাকে দিচ্ছি?
খাদ্য পেয়েছি—কাকে স্মরণ করছি?
বিজ্ঞান ও উপায় পেয়েছি—আমি কি সেগুলো দায়িত্বশীলভাবে ব্যবহার করছি?
মানুষের কাছ থেকে উপকার পেয়েছি—আমি কি তা মনে রেখেছি?
আর সবচেয়ে বড় প্রশ্ন—
যাঁর কাছ থেকে আমার সবকিছু, তাঁর জন্য আমার জীবনে কতটুকু জায়গা আছে?
হয়তো কৃতজ্ঞতার প্রকৃত সংজ্ঞা ‘ধন্যবাদ’ শব্দের মধ্যে নেই।
হয়তো কৃতজ্ঞতা হলো এমন এক জীবন, যার প্রতিটি কাজ নীরবে বলে—
“আমি পেয়েছি। আমি জানি কার কাছ থেকে পেয়েছি। আর তাই আমি তাঁর প্রতি বিশ্বস্ত থাকতে চাই।”
সেখানেই ‘শুকর’ শব্দটি একটি উচ্চারণ থেকে জীবনের দর্শনে পরিণত হয়।
আর সেখানেই মানুষ অকৃতজ্ঞতার পক্ষাঘাত থেকে ধীরে ধীরে মুক্ত হতে শুরু করে।