বাংলাদেশের অর্থনীতি এখন এক সন্ধিক্ষণে

প্রবৃদ্ধির পুরোনো মডেল কি যথেষ্ট? উচ্চ মূল্যস্ফীতি, দুর্বল ব্যাংকিং খাত, কম রাজস্ব আদায় ও এলডিসি উত্তরণের চ্যালেঞ্জে বাংলাদেশকে এখন ঠিক করতে হবে তার পরবর্তী অর্থনৈতিক পথ

সাইফুল ইসলাম

একসময় বাংলাদেশের অর্থনীতির গল্পটি ছিল আশাবাদের গল্প। দারিদ্র্য কমছে, রপ্তানি বাড়ছে, কর্মসংস্থান তৈরি হচ্ছে, বিদ্যুৎ পৌঁছে যাচ্ছে ঘরে ঘরে। তৈরি পোশাকশিল্প দেশের অর্থনীতির অন্যতম প্রধান চালিকাশক্তি হয়ে উঠেছে। লাখো নারী শ্রমবাজারে যুক্ত হয়েছেন। মানুষের গড় আয়ু বেড়েছে। দীর্ঘ সময় ধরে কমেছে দারিদ্র্য।

সেই গল্পে একটি সরল রেখা ছিল—সামনে এগিয়ে যাওয়া।

কিন্তু অর্থনীতির সাফল্যের গল্পও একসময় নতুন প্রশ্নের মুখোমুখি হয়।

বাংলাদেশ এখন তেমনই এক সন্ধিক্ষণে দাঁড়িয়ে।

প্রবৃদ্ধির গতি কমেছে। মূল্যস্ফীতি সাধারণ মানুষের ক্রয়ক্ষমতায় চাপ তৈরি করছে। ব্যাংকিং খাতে খেলাপি ঋণ বড় উদ্বেগ হয়ে উঠেছে। রাজস্ব আদায় প্রত্যাশার তুলনায় কম। বেসরকারি বিনিয়োগে গতি ফেরেনি। এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে স্বল্পোন্নত দেশের (এলডিসি) তালিকা থেকে উত্তরণের পর বদলে যাওয়া বৈশ্বিক বাণিজ্য বাস্তবতা।

তাই প্রশ্নটি এখন শুধু বাংলাদেশ কত দ্রুত বাড়বে—তা নয়।

আরও গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন হলো, বাংলাদেশ কীভাবে বাড়বে?



প্রবৃদ্ধির পুরোনো ইঞ্জিনে গতি কমেছে

গত এক দশকে বাংলাদেশের প্রকৃত জিডিপি প্রবৃদ্ধি গড়ে প্রায় ৬ শতাংশের কাছাকাছি ছিল। কিন্তু সেই গতি এখন আর আগের মতো নেই।

সংযুক্ত অর্থনৈতিক বিশ্লেষণ অনুযায়ী, ২০২৩-২৪ অর্থবছরে প্রবৃদ্ধি নেমে আসে ৪ দশমিক ২ শতাংশে এবং ২০২৪-২৫ অর্থবছরে তা প্রায় ৩ দশমিক ৫ থেকে ৩ দশমিক ৭ শতাংশে দাঁড়ায়। সংস্কার সফল হলে আগামী কয়েক বছরে প্রবৃদ্ধি আবার বাড়তে পারে এবং দীর্ঘমেয়াদে ৬ থেকে ৬ দশমিক ৫ শতাংশ সম্ভাব্য প্রবৃদ্ধিতে পৌঁছানোর সুযোগ রয়েছে।

অর্থাৎ বাংলাদেশের সম্ভাবনা শেষ হয়ে যায়নি। বরং এখন প্রয়োজন সেই সম্ভাবনাকে বাস্তব অর্থনৈতিক শক্তিতে রূপ দেওয়া।

আর সেখানেই সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ।



মূল্যস্ফীতি যখন চলে আসে মানুষের রান্নাঘরে

অর্থনীতির বড় বড় সংখ্যা অনেক সময় সাধারণ মানুষের কাছে দূরের বিষয়। কিন্তু মূল্যস্ফীতি কোনো দূরের বিষয় নয়।

চালের দাম বাড়লে তা বোঝা যায়।
ওষুধের দাম বাড়লে বোঝা যায়।
বাসভাড়া বাড়লে বোঝা যায়।
বাজারের ব্যাগ আগের চেয়ে হালকা হলে বোঝা যায়।

সংযুক্ত বিশ্লেষণে ২০২৬ সালের জুলাইয়ে মূল্যস্ফীতি ৯ দশমিক ১৬ শতাংশে পৌঁছানোর কথা উল্লেখ করা হয়েছে। একই সঙ্গে ২০২৫-২৬ অর্থবছরে গড় মূল্যস্ফীতি ৮ দশমিক ৫ থেকে ৮ দশমিক ৯ শতাংশের মধ্যে থাকতে পারে বলে পূর্বাভাস দেওয়া হয়েছে।

এর সবচেয়ে বড় প্রভাব পড়ে নিম্ন ও মধ্যম আয়ের মানুষের ওপর। কারণ আয় যদি দ্রব্যমূল্যের সঙ্গে তাল মিলিয়ে না বাড়ে, তাহলে কাগজে আয় বাড়লেও বাস্তবে জীবনযাত্রার মান কমে যায়।

এর প্রতিফলন দারিদ্র্যের পরিসংখ্যানেও দেখা যাচ্ছে।

জাতীয় দারিদ্র্যের হার ২০২২ সালের ১৮ দশমিক ৭ শতাংশ থেকে ২০২৫ সালে ২১ দশমিক ৪ শতাংশে বেড়েছে বলে বিশ্লেষণে উল্লেখ করা হয়েছে।

এখানেই অর্থনীতির আসল পরীক্ষা।

জিডিপি বাড়ছে কি না, তার চেয়েও গুরুত্বপূর্ণ—মানুষের জীবন কতটা ভালো হচ্ছে।




ব্যাংকিং খাত: অর্থনীতির নীরব ঝুঁকি

বাংলাদেশের অর্থনীতির সবচেয়ে বড় কাঠামোগত দুর্বলতাগুলোর একটি এখন ব্যাংকিং খাত।

সংযুক্ত বিশ্লেষণ অনুযায়ী, ২০২৫ সালের শেষ দিকে বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলোর খেলাপি ঋণের হার প্রায় ৩০ দশমিক ৬ থেকে ৩৪ শতাংশে পৌঁছেছিল।

এটি শুধু ব্যাংকারদের সমস্যা নয়।

একটি ব্যাংক যখন নিজের আর্থিক অবস্থান নিয়ে অনিশ্চিত হয়ে পড়ে, তখন ঋণ দেওয়ার সক্ষমতা ও আগ্রহ—দুটিই কমে যায়।

ব্যবসা প্রতিষ্ঠান ঋণ না পেলে বিনিয়োগ কমায়।

বিনিয়োগ কমলে নতুন কারখানা তৈরি হয় না।

নতুন কারখানা তৈরি না হলে নতুন কর্মসংস্থানও কমে।

অর্থাৎ—

ব্যাংকিং সংকট শেষ পর্যন্ত কর্মসংস্থান সংকটে পরিণত হতে পারে।

সংযুক্ত বিশ্লেষণে বেসরকারি খাতে ঋণ প্রবৃদ্ধি ৭ দশমিক ৬ শতাংশে নেমে যাওয়ার কথা বলা হয়েছে; প্রকৃত হিসাবে এটি প্রায় ২ শতাংশ সংকোচনের সমান।

তাই ব্যাংকিং খাত সংস্কার কোনো নিছক আর্থিক সংস্কার নয়।

এটি কর্মসংস্থানের সংস্কার।
এটি বিনিয়োগের সংস্কার।
এটি দারিদ্র্য হ্রাসের সংস্কার।



রাজস্ব আদায়: রাষ্ট্রের সক্ষমতার প্রশ্ন

বাংলাদেশের আরেকটি দীর্ঘদিনের দুর্বলতা হলো রাজস্ব আদায়।

সংযুক্ত বিশ্লেষণ অনুযায়ী, ২০২৪-২৫ অর্থবছরে কর-জিডিপি অনুপাত ৭ শতাংশের নিচে নেমে গেছে।

কিন্তু উন্নত অবকাঠামো, মানসম্মত শিক্ষা, ভালো স্বাস্থ্যসেবা, সামাজিক নিরাপত্তা এবং জলবায়ু পরিবর্তনের ঝুঁকি মোকাবিলায় রাষ্ট্রের বিপুল অর্থ প্রয়োজন।

সুতরাং প্রশ্নটি শুধু করের হার কত হবে—তা নয়।

প্রশ্ন হলো, রাষ্ট্র কতটা দক্ষতার সঙ্গে রাজস্ব সংগ্রহ করতে পারে এবং সেই অর্থ কতটা কার্যকরভাবে জনগণের জন্য ব্যয় করতে পারে।

ডিজিটাল করব্যবস্থা, ইলেকট্রনিক পেমেন্ট, একীভূত করদাতা শনাক্তকরণ এবং ঝুঁকিভিত্তিক অডিট—এসব উদ্যোগ করব্যবস্থাকে আরও স্বচ্ছ ও কার্যকর করতে পারে।

লক্ষ্য হওয়া উচিত—

কর দেওয়া সহজ করা এবং কর ফাঁকি কঠিন করা।




২৪ নভেম্বর ২০২৬: নতুন অর্থনৈতিক বাস্তবতার দ্বারপ্রান্তে

বাংলাদেশের সামনে এখন আরেকটি ঐতিহাসিক মাইলফলক—স্বল্পোন্নত দেশের (এলডিসি) তালিকা থেকে উত্তরণ।

বর্তমান সূচি অনুযায়ী, ২৪ নভেম্বর ২০২৬ বাংলাদেশ এলডিসি শ্রেণি থেকে উত্তরণের কথা রয়েছে। সরকার অবশ্য উত্তরণের সময়সীমা বাড়ানোর আবেদন করেছে।

এটি বাংলাদেশের উন্নয়নযাত্রার একটি বড় স্বীকৃতি।

কিন্তু অর্জনের সঙ্গে নতুন দায়িত্বও আসে।

এলডিসি হিসেবে পাওয়া কিছু বাণিজ্য সুবিধা ভবিষ্যতে কমে যেতে পারে। ফলে আন্তর্জাতিক বাজারে বাংলাদেশের পণ্যকে আরও বেশি প্রতিযোগিতার মুখোমুখি হতে হবে।

সবচেয়ে বড় ঝুঁকি তৈরি হতে পারে তৈরি পোশাক খাতে।

সংযুক্ত বিশ্লেষণ অনুযায়ী, বাংলাদেশের রপ্তানি আয়ের ৮০ শতাংশের বেশি আসে তৈরি পোশাক খাত থেকে।

এখানেই বাংলাদেশের সামনে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্নটি দাঁড়ায়

একটি শিল্পের সাফল্যের ওপর নির্ভর করেই কি পরবর্তী অর্থনৈতিক অধ্যায়ে প্রবেশ করা যাবে?

উত্তর সম্ভবত না।

বাংলাদেশকে এখন রপ্তানি বহুমুখীকরণের দিকে যেতে হবে।



পোশাকশিল্পের সাফল্যের পর কী?

তৈরি পোশাক বাংলাদেশের অর্থনৈতিক ইতিহাসের অন্যতম বড় সাফল্য।

কিন্তু পরবর্তী ধাপ শুধু আরও বেশি পোশাক তৈরি করা নয়।

প্রয়োজন আরও উচ্চমূল্যের পণ্য, প্রযুক্তিনির্ভর উৎপাদন, দক্ষ শ্রমিক, উন্নত নকশা, প্রযুক্তিগত বস্ত্র এবং উৎপাদনশীলতা বৃদ্ধি।

বাংলাদেশ ইতিমধ্যে প্রমাণ করেছে যে কম খরচে উৎপাদন করতে পারে।

এখন প্রমাণ করতে হবে—

বাংলাদেশ উচ্চমানের এবং উচ্চমূল্যের পণ্যও বিশ্ববাজারে প্রতিযোগিতামূলকভাবে উৎপাদন করতে পারে।



পোশাকের বাইরে: ওষুধশিল্পের সম্ভাবনা

বাংলাদেশের দ্বিতীয় প্রজন্মের শিল্পায়নের একটি সম্ভাবনাময় ক্ষেত্র হতে পারে ওষুধশিল্প।

সংযুক্ত বিশ্লেষণ অনুযায়ী, দেশের ওষুধ প্রস্তুতকারকেরা স্থানীয় থেরাপিউটিক চাহিদার প্রায় ৯৮ শতাংশ পূরণ করে এবং ২০২৪-২৫ অর্থবছরে প্রায় ১৫০টি দেশে প্রায় ২১ কোটি ৩০ লাখ ডলারের ওষুধ রপ্তানি করেছে।

এটি শুধু একটি শিল্পের সাফল্য নয়; এটি বাংলাদেশের সক্ষমতার একটি উদাহরণ।

কিন্তু এলডিসি উত্তরণের পর মেধাস্বত্ব, পেটেন্ট, লাইসেন্সিং ও পরীক্ষার ক্ষেত্রে নতুন বাস্তবতা তৈরি হবে।

তাই এখন থেকেই প্রস্তুতি প্রয়োজন।

গবেষণা ও উন্নয়ন, বায়োসিমিলার, ওষুধের কাঁচামাল উৎপাদন এবং শক্তিশালী নিয়ন্ত্রক কাঠামোতে বিনিয়োগ বাড়াতে হবে।

লক্ষ্য হওয়া উচিত শুধু দেশের চাহিদা পূরণ নয়।

বিশ্ববাজারে একটি নির্ভরযোগ্য ও উচ্চমানের উৎপাদক হিসেবে বাংলাদেশের অবস্থান তৈরি করা।




বৈশ্বিক সংকট থেকে বাংলাদেশ কতটা নিরাপদ?

বাংলাদেশের অর্থনীতি এখন বিশ্বের সঙ্গে গভীরভাবে যুক্ত।

জ্বালানির দাম, যুদ্ধ, বৈশ্বিক সুদের হার, আন্তর্জাতিক বাণিজ্যনীতি এবং প্রবাসী আয়—সবকিছুই দেশের অর্থনীতিতে প্রভাব ফেলে।

সংযুক্ত বিশ্লেষণে মধ্যপ্রাচ্যে দীর্ঘস্থায়ী সংঘাতের সম্ভাব্য প্রভাব হিসেবে জ্বালানির দাম বৃদ্ধি, সরকারি ভর্তুকির চাপ এবং প্রবাসী আয় কমে যাওয়ার ঝুঁকির কথা বলা হয়েছে।

বাংলাদেশ বৈশ্বিক সংকট ঠেকাতে পারবে না।

কিন্তু নিজেকে সংকট-সহনশীল করে তুলতে পারবে।

তার জন্য প্রয়োজন শক্তিশালী বৈদেশিক মুদ্রার অবস্থান, রপ্তানি বহুমুখীকরণ, জ্বালানি দক্ষতা, শক্তিশালী আর্থিক প্রতিষ্ঠান এবং পর্যাপ্ত সরকারি আর্থিক সক্ষমতা।



সংকটের মধ্যেই বড় সুযোগ

সবকিছু বিবেচনা করলে বাংলাদেশের অর্থনীতিকে শুধু সংকটের গল্প হিসেবে দেখা ভুল হবে।

বাংলাদেশের রয়েছে ১৭ কোটির বেশি মানুষের বিশাল অভ্যন্তরীণ বাজার, ক্রমবর্ধমান শিল্পভিত্তি, তরুণ জনগোষ্ঠী এবং দক্ষিণ ও দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার গুরুত্বপূর্ণ ভৌগোলিক অবস্থান।

সংযুক্ত বিশ্লেষণ অনুযায়ী, দেশের বিদ্যুৎ-সংযোগ ৯৯ দশমিক ৫ শতাংশ পরিবারের কাছে পৌঁছেছে এবং মানুষের গড় আয়ু প্রায় ৭৫ বছরে উন্নীত হয়েছে।

এগুলো বাংলাদেশের ভবিষ্যৎ সম্ভাবনার গুরুত্বপূর্ণ ভিত্তি।

কিন্তু সম্ভাবনাকে বাস্তবে রূপ দিতে প্রয়োজন বিনিয়োগ।

সংযুক্ত বিশ্লেষণে বাংলাদেশের এফডিআই স্টক প্রায় ১৮ দশমিক ৮ বিলিয়ন ডলার এবং বিনিয়োগের ক্ষেত্রে নিয়ন্ত্রক অনিশ্চয়তা, জমি অধিগ্রহণ, লজিস্টিক ব্যয় ও জ্বালানি অবকাঠামোর সীমাবদ্ধতার কথা বলা হয়েছে।

এই বাধাগুলো দূর করতে পারলে বাংলাদেশের বিশাল বাজারই বৈশ্বিক বিনিয়োগকারীদের কাছে বড় আকর্ষণ হয়ে উঠতে পারে।



পরবর্তী অর্থনৈতিক বিপ্লব হবে প্রাতিষ্ঠানিক

বাংলাদেশের প্রথম অর্থনৈতিক রূপান্তর ঘটেছিল শ্রম, উদ্যোক্তা ও রপ্তানিকে কেন্দ্র করে।

পরবর্তী রূপান্তরের জন্য প্রয়োজন হবে প্রতিষ্ঠানের শক্তি।

ব্যাংক হতে হবে জবাবদিহিমূলক।

করব্যবস্থা হতে হবে আধুনিক।

বিনিয়োগকারীদের জন্য প্রয়োজন পূর্বানুমানযোগ্য নীতি।

বন্দর ও যোগাযোগব্যবস্থাকে হতে হবে দক্ষ।

বিদ্যুৎ সরবরাহ হতে হবে নির্ভরযোগ্য।

কারিগরি শিক্ষাকে শিল্পের প্রয়োজনের সঙ্গে যুক্ত করতে হবে।

আর একজন উদ্যোক্তা যেন অপ্রয়োজনীয় প্রশাসনিক জটিলতায় আটকে না যান—সেটিও নিশ্চিত করতে হবে।

কারণ একটি দেশের অর্থনীতি শুধু বড় কয়েকটি কোম্পানি দিয়ে এগোয় না।

হাজার হাজার ছোট ও মাঝারি প্রতিষ্ঠান যখন বড় হতে শুরু করে, তখনই অর্থনীতির ভিত শক্ত হয়।



বাংলাদেশের সামনে আসল নির্বাচন

বাংলাদেশের বর্তমান পরিস্থিতিকে শুধু মন্দা বনাম পুনরুদ্ধারের প্রশ্ন হিসেবে দেখলে ভুল হবে।

এটি আসলে স্থবিরতা বনাম রূপান্তরের নির্বাচন।

দীর্ঘমেয়াদে বাংলাদেশের ৬ থেকে ৬ দশমিক ৫ শতাংশ সম্ভাব্য প্রবৃদ্ধির কথা সংযুক্ত বিশ্লেষণে বলা হয়েছে। কিন্তু সেই সম্ভাবনা বাস্তবায়ন নির্ভর করবে আর্থিক, রাজস্ব ও প্রাতিষ্ঠানিক সংস্কারের ওপর।

সেই সংস্কারের অর্থ—

ব্যাংকিং খাত পরিষ্কার করা,
করব্যবস্থা আধুনিক করা,
মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে বিশ্বাসযোগ্য নীতি বজায় রাখা,
রপ্তানি বহুমুখীকরণ,
বিদেশি বিনিয়োগের পরিবেশ উন্নত করা,
তরুণদের দক্ষ করে তোলা,
নারীর শ্রমবাজারে অংশগ্রহণ বাড়ানো,
উৎপাদনশীল কর্মসংস্থান তৈরি করা
এবং জলবায়ু ঝুঁকি মোকাবিলায় বিনিয়োগ করা।

সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হলো—এমন প্রতিষ্ঠান তৈরি করা, যা ব্যক্তি বা সরকারের পরিবর্তনের সঙ্গে দুর্বল হয়ে পড়বে না।



শেষ কথা: বাংলাদেশের পরবর্তী গল্প

বাংলাদেশ গত পাঁচ দশকে বিশ্বকে দেখিয়েছে—প্রতিকূলতা মানেই পরাজয় নয়।

ঘূর্ণিঝড় এসেছে। বন্যা এসেছে। বৈশ্বিক সংকট এসেছে। অর্থনৈতিক চাপ এসেছে। তবু বাংলাদেশ এগিয়েছে।

কিন্তু টিকে থাকা উন্নয়নের শেষ লক্ষ্য নয়।

লক্ষ্য হলো সমৃদ্ধি।

পরবর্তী প্রজন্মের বাংলাদেশে একজন তরুণ শুধু একটি চাকরি চাইবে না; সে চাইবে ভালো ও মর্যাদাপূর্ণ চাকরি।

একজন উদ্যোক্তা চাইবে এমন ব্যাংক, যেখানে যোগ্যতার ভিত্তিতে ঋণ পাওয়া যায়।

একজন নারী চাইবেন নিরাপদ ও সমান সুযোগের কর্মক্ষেত্র।

একটি পরিবার চাইবে এমন আয়, যা মূল্যস্ফীতির সঙ্গে পাল্লা দিতে পারে।

একজন কৃষক চাইবেন স্থানীয় বাজারের পাশাপাশি বৈশ্বিক বাজারে পৌঁছানোর সুযোগ।

এটাই হবে প্রকৃত অর্থনৈতিক অগ্রগতি।

বাংলাদেশের সামনে তাই এখন দুটি পথ।

একটি—পুরোনো সাফল্যের ওপর নির্ভর করে ধীরে ধীরে এগিয়ে যাওয়া।

অন্যটি—কঠিন কিন্তু প্রয়োজনীয় সংস্কারের পথ।

ব্যাংকিং খাত সংস্কার, রাজস্ব সক্ষমতা বৃদ্ধি, রপ্তানি বহুমুখীকরণ, দক্ষ মানবসম্পদ তৈরি, বিদেশি বিনিয়োগ আকর্ষণ এবং শক্তিশালী প্রতিষ্ঠান গড়ে তোলার পথ।

বাংলাদেশ ইতিমধ্যে প্রমাণ করেছে যে সে বাঁচতে পারে।

এখন তাকে প্রমাণ করতে হবে—

সে আরও উৎপাদনশীল হতে পারে।

সে আরও প্রতিযোগিতামূলক হতে পারে।

সে এমন সমৃদ্ধি তৈরি করতে পারে, যার সুফল সমাজের বৃহত্তর অংশের কাছে পৌঁছাবে।

বাংলাদেশের পরবর্তী অর্থনৈতিক গল্প তাই শুধু প্রবৃদ্ধির গল্প নয়।

এটি রূপান্তরের গল্প—সংকট থেকে সক্ষমতায়, সক্ষমতা থেকে উৎপাদনশীলতায় এবং উৎপাদনশীলতা থেকে সবার জন্য সমৃদ্ধির পথে বাংলাদেশের যাত্রার গল্প।

Leave a Comment