
🎙️ VOIB Radio Special Report
VOIB SPECIAL COVERAGE | POLITICS & RELIGION
বিবেকের কাঠগড়ায় ধর্মীয় স্বাতন্ত্র্য: রাষ্ট্র কি নির্ধারণ করতে পারে নাগরিকের ইমান? বৈষম্যবিরোধী আন্দোলনের পর গঠিত নতুন বাংলাদেশের সামনে নতুন শঙ্কা—সংখ্যালঘুদের অমুসলমান ঘোষণার রাষ্ট্রীয় দাবি কি সামাজিক ঐক্যকে আরও খণ্ড-বিখণ্ড করবে?
১. নতুন বাংলাদেশ ও নতুন বিভক্তির সংকট
বাংলাদেশ আজ এক ঐতিহাসিক মোড়ে দাঁড়িয়ে। বৈষম্যবিরোধী গণ-অভ্যুত্থানের সফলতার পর যখন একটি নতুন সামাজিক চুক্তি, সমতা ও গণতান্ত্রায়নের স্বপ্ন দেখা হচ্ছিল, ঠিক তখনই দেশজুড়ে মাথাচাড়া দিয়ে উঠেছে একটি নতুন ও অত্যন্ত সংবেদনশীল বিতর্ক—আহমদীয়া সম্প্রদায়কে রাষ্ট্রীয়ভাবে ‘অমুসলমান’ ঘোষণা করার রাজনৈতিক ও ধর্মীয় দাবি।
একটি নিগৃহীত ও নির্যাতিত সমাজ যেখানে সার্বিক জাতীয় ঐক্য এবং পুনর্গঠন ছিল মুখ্য লক্ষ্য, সেখানে আবার নতুন করে ধর্মীয় বিভক্তি তৈরি করা কি রাষ্ট্রের স্থিতিশীলতার জন্য বিপজ্জনক নয়? প্রশ্ন উঠছে—যেখানে বিশ্বব্যাপী মুসলিম উম্মাহ অভ্যন্তরীণ দলাদলি ও ডিভাইড-অ্যান্ড-রুল (Divide and Rule) নীতির শিকার, সেখানে নিজ দেশের নাগরিকদের সনদে সনদে ভাগ করার রাজনৈতিক অপচেষ্টা কার স্বার্থ রক্ষা করে?
২. রাষ্ট্রের একতিয়ারের সীমানা ও ভৌগোলিক প্রহসন
রাষ্ট্র কি তার জনগণের ধর্মীয় পরিচয় ও ইমান নির্ধারণের অধিকার রাখে? এই প্রশ্নটি এখন কেবল ধর্মীয় নয়, বরং মৌলিক মানবাধিকার ও সংবিধানের দর্শনের সাথে যুক্ত।
মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে ডোনাল্ড ট্রাম্প যদি আজ ঘোষণা দেন যে সেখানকার সব মুসলিম এখন থেকে খ্রিস্টান, তবে বিশ্বের যেকোনো সুস্থ মস্তিষ্কের মানুষ তা হেসে উড়িয়ে দেবে। কারণ রাষ্ট্র বা কোনো রাজনৈতিক সংসদ কখনোই ধর্মজগতের ঐশী অথরিটি হতে পারে না।
“রাত ১২টার সময় যে ব্যক্তি একই কলেমা, নামাজ, হজ ও জাকাত পালন করছেন, রাত ১২টা ১ মিনিটে কোনো বিশ্বাসগত পরিবর্তন ছাড়াই রাষ্ট্র কীভাবে তাঁকে অমুসলমান বানিয়ে দেয়?” — মাওলানা আব্দুল আওয়াল সাহেব (VOIB Radio Analysis)
সীমান্তের রাজনীতি কীভাবে ধর্মের হাস্যকর প্রহসন তৈরি করে, তার বড় প্রমাণ ভারত-পাকিস্তান বাঘাহ বর্ডার। একজন আহমদী মুসলিম তাঁর ডান পা ভারতের মাটিতে রাখলে তিনি আইনত মুসলিম, কিন্তু সীমান্ত পেরিয়ে বাম পা পাকিস্তানে রাখলেই রাষ্ট্র তাঁকে ‘অমুসলমান’ বলে গণ্য করে! ভৌগোলিক সীমানা দিয়ে কি অন্তরের বিশ্বাস মাপা সম্ভব?
৩. কুরআনের শিক্ষা ও ইতিহাস
ইসলামের ইতিহাস স্মরণ করিয়ে দেয় যে, রাষ্ট্রশক্তি যখনই বিশ্বাসের ওপর নিজের সিদ্ধান্ত চাপিয়ে দিতে গেছে, তখনই সামাজিক বিপর্যয় ঘটেছে। মুসা (আঃ) ও হারুন (আঃ)-এর বিরুদ্ধে ফেরাউনের রাষ্ট্রীয় সিদ্ধান্ত ও তাদের পরিষদের ঘোষণা আল্লাহর বিচারে কোনো মূল্যই পায়নি। ধর্মীয় বিষয়ে রাষ্ট্রীয় হস্তক্ষেপ তাই কেবল রাজনৈতিক অদূরদর্শিতাই প্রকাশ করে না, বরং রাষ্ট্রকে রসাতলের দিকে ঠেলে দেয়।
৪. ৭৩ ফেরকা ও কঠিন রাজনৈতিক চ্যালেঞ্জ
হাদিস শরিফ অনুযায়ী উম্মতের মধ্যে ৭৩টি দল বা ফেরকা হবে। রাষ্ট্র যদি কোনো নির্দিষ্ট একটি গোষ্ঠীকে কাফের বা অমুসলমান ঘোষণার ক্ষমতা দাবি করে, তবে রাষ্ট্রের প্রতি বিপরীত প্রশ্ন হলো—কাউকে কাফের না বলে এই ৭৩টি দলের মধ্যে কোনটি ১০০% নির্ভেচাল ও খাঁটি দল, তা সংসদে ফতোয়া দিয়ে সনদে ঘোষণা করুক!
বাস্তবতা হলো, কোনো রাষ্ট্র বা সরকারের সেই নৈতিক বা ধর্মীয় ক্ষমতা নেই। যে ক্ষেত্রে খাঁটি ইসলামী দল চিহ্নিত করার শক্তি রাষ্ট্রের নেই, সে ক্ষেত্রে কাকে অমুসলমান ঘোষণা করা হবে—সেই সিদ্ধান্ত নেওয়ার অধিকার রাষ্ট্র কোথায় পায়?
৫. উপসংহার: সুমতির আকুল আবেদন
যাঁরা আজ অন্যদের অমুসলমান ফতোয়া আদায়ের জন্য রাজপথে নামছেন, তাঁরা নিজেরা মুসলিম হওয়ার কোন সনদপত্র কোন রাষ্ট্রের কাছ থেকে পেয়ে এসেছেন? বিশ্বাস ও ধর্ম মানুষের অন্তরের বিষয়, যা রাষ্ট্রযন্ত্রের রাবার স্ট্যাম্প দিয়ে নিয়ন্ত্রিত হতে পারে না।
প্রতিবেশি দেশ বা বিশ্ব রাজনীতির ইতিহাস সাক্ষী—ধর্মীয় বিভেদের রাজনীতি যে দেশকে গ্রাস করেছে, সেই দেশই ধ্বংসের মুখে পড়েছে। বাংলাদেশকে রক্ষা করতে হলে চরমপন্থা ও বিভাজনের বদলে প্রজ্ঞা ও সুমতির জয় হওয়া অপরিহার্য।