
তাওয়াক্কুলের শক্তি এবং এক অস্থির পৃথিবীতে মহানবী (সা.)-এর শিক্ষা
টিলফোর্ড, ইংল্যান্ড — ৪ সেপ্টেম্বর ২০২৬
সেদিন পৃথিবী শান্ত ছিল না।
দূরের কোনো যুদ্ধের শব্দ হয়তো টিলফোর্ডের শরতের নরম বাতাসে এসে পৌঁছায়নি। বাজারের ওঠানামাও মসজিদ মোবারকের নীরব প্রাঙ্গণে দৃশ্যমান ছিল না। কিন্তু পৃথিবীর উদ্বেগ মানুষের সঙ্গে সঙ্গেই এখানে এসে পৌঁছেছিল—ভবিষ্যৎ নিয়ে অনিশ্চয়তা, অর্থনীতি নিয়ে উৎকণ্ঠা, নিরাপত্তা নিয়ে ভয় এবং ক্রমশ বিভক্ত হয়ে পড়া একটি পৃথিবীর অদৃশ্য চাপ।
তারপর খুতবা শুরু হলো।
হযরত মির্যা মসরূর আহমদ (আই.) মহানবী হযরত মুহাম্মাদ (সা.)-এর জীবনের একটি বিশেষ গুণের দিকে দৃষ্টি আকর্ষণ করলেন—তাওয়াক্কুল: আল্লাহর ওপর পূর্ণ নির্ভরতা। খুতবার সরকারি সারাংশেও এই বিষয়টিকেই কেন্দ্রে রাখা হয়েছে—মহানবী (সা.) কীভাবে আল্লাহর ওপর ভরসা করেছেন, মানুষকে তা শিক্ষা দিয়েছেন এবং নিজের জীবন দিয়ে তার দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছেন।
এটি শুনতে হয়তো একটি পুরোনো ধর্মীয় শিক্ষা বলে মনে হতে পারে।
কিন্তু আসলে প্রশ্নটি অত্যন্ত আধুনিক:
যে পৃথিবীতে মানুষ সবকিছু নিয়ন্ত্রণ করতে চায়, সেখানে কীভাবে এমনভাবে বাঁচা যায়—যখন সবকিছু নিজের নিয়ন্ত্রণে থাকে না?
সম্ভবত মহানবী (সা.)-এর তাওয়াক্কুলের শিক্ষার সবচেয়ে গভীর প্রাসঙ্গিকতা এখানেই।
—
যখন সবকিছু হারানোর পরও ভয় থাকে না
তাওয়াক্কুলকে প্রায়ই ভুলভাবে ভাগ্যের কাছে আত্মসমর্পণ হিসেবে বোঝা হয়।
মহানবী (সা.)-এর জীবন তার সম্পূর্ণ বিপরীত।
তাওয়াক্কুল মানে চেষ্টা পরিত্যাগ করা নয়। বরং এটি মানুষকে তার কর্তব্য সম্পূর্ণ করার পর ফলাফলের উদ্বেগ থেকে নিজেকে মুক্ত করতে শেখায়।
পবিত্র কুরআনের ভাষায়, যে ব্যক্তি আল্লাহর ওপর ভরসা করে, আল্লাহ তার জন্য যথেষ্ট।
এই একটি বিশ্বাস একজন মানুষের মানসিক কাঠামো বদলে দিতে পারে।
কারণ ভয় সাধারণত জন্ম নেয় একটি প্রশ্ন থেকে:
“যদি সবকিছু আমার ইচ্ছামতো না হয়?”
তাওয়াক্কুল সেই প্রশ্নের উত্তর দেয়:
“সবকিছু আমার ইচ্ছামতো না হলেও, আমি একা নই।”
মহানবী (সা.)-এর জীবন এই বিশ্বাসের জীবন্ত ব্যাখ্যা।
মক্কার শক্তিশালী গোত্রগুলো তাঁর বিরুদ্ধে দাঁড়িয়েছিল। তাঁকে নির্যাতন করা হয়েছে। তাঁর অনুসারীদের ওপর অত্যাচার হয়েছে। তাঁকে হত্যা করার ষড়যন্ত্র হয়েছে। তাঁকে নিজের জন্মভূমি ছেড়ে যেতে হয়েছে।
তবু তাঁর কণ্ঠে হতাশার পরাজয় শোনা যায়নি।
কারণ তাঁর দৃষ্টি ছিল মানুষের শক্তির ওপরে নয়—আল্লাহর শক্তির দিকে।
—
একটি গুহা, কয়েকজন শত্রু এবং এক অদ্ভুত প্রশান্তি
মহানবী (সা.)-এর হিজরতের সেই দৃশ্য ইসলামের ইতিহাসে তাওয়াক্কুলের সবচেয়ে শক্তিশালী প্রতীকগুলোর একটি।
তিনি ও তাঁর সঙ্গী হযরত আবু বকর (রা.) একটি গুহায় আশ্রয় নিয়েছেন। বাইরে অনুসরণকারীরা।
মানবিক বিচারে এটি ছিল চরম বিপদের মুহূর্ত।
কিন্তু সেই মুহূর্তে মহানবী (সা.) তাঁর সঙ্গীকে আশ্বস্ত করেছিলেন—“দুঃখ করো না; নিশ্চয়ই আল্লাহ আমাদের সঙ্গে আছেন।”
এখানে তাওয়াক্কুলের একটি মৌলিক সত্য প্রকাশিত হয়।
বিশ্বাস বিপদকে অস্বীকার করে না।
বিশ্বাস বিপদের মধ্যেও আল্লাহর উপস্থিতিকে দেখতে শেখায়।
এই পার্থক্যটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
কারণ সাহসী মানুষও ভয় পেতে পারে। কিন্তু তাওয়াক্কুলসম্পন্ন মানুষ ভয়ের কাছে আত্মসমর্পণ করে না।
—
উটটি বেঁধে রাখো
মহানবী (সা.)-এর তাওয়াক্কুলের দর্শনকে একটি ছোট অথচ গভীর শিক্ষায় সংক্ষেপ করা যায়।
এক ব্যক্তি তাঁর উটকে বেঁধে না রেখে আল্লাহর ওপর ভরসা করার কথা বলেছিলেন। মহানবী (সা.) তাকে শেখালেন—আগে উটটি বেঁধে রাখো, তারপর আল্লাহর ওপর ভরসা করো।
এই শিক্ষার সৌন্দর্য এর সরলতায়।
উপায় গ্রহণ করো।
সর্বোচ্চ চেষ্টা করো।
দায়িত্ব পালন করো।
তারপর ফলাফল আল্লাহর হাতে ছেড়ে দাও।
তাওয়াক্কুল তাই নিষ্ক্রিয়তার দর্শন নয়; এটি দায়িত্বশীলতার দর্শন।
মানুষ কাজ করবে, কিন্তু কাজের ফলাফলকে নিজের অস্তিত্বের একমাত্র মাপকাঠি বানাবে না।
আজকের কর্মজীবী মানুষের জন্য এর চেয়ে প্রাসঙ্গিক শিক্ষা আর কী হতে পারে?
আমরা লক্ষ্য নির্ধারণ করি। পরিকল্পনা করি। সঞ্চয় করি। ক্যারিয়ার গড়ি। সন্তানদের ভবিষ্যৎ নিয়ে ভাবি।
তারপরও নিশ্চয়তা পাই না।
তাওয়াক্কুল সেই অনিশ্চয়তার মধ্যেই শান্তির একটি স্থান তৈরি করে।
—
পাখির শিক্ষা
মহানবী (সা.) তাওয়াক্কুল বোঝাতে পাখির দৃষ্টান্ত দিয়েছেন।
পাখি সকালে ক্ষুধার্ত অবস্থায় বাসা থেকে বেরিয়ে যায়। সন্ধ্যায় ফিরে আসে আহার নিয়ে।
পাখি অপেক্ষা করে না।
সে উড়ে যায়।
এখানেই উপমাটির গভীরতা।
আল্লাহর ওপর ভরসা মানে ঘরে বসে থাকা নয়। বরং ভরসা নিয়ে বাইরে বেরিয়ে পড়া।
মানুষের কর্তব্য হলো দরজা পর্যন্ত যাওয়া। দরজা খুলবে কি না—সেটি তার হাতে নয়।
এই দর্শন আধুনিক জীবনের এক বড় মানসিক সংকটেরও উত্তর হতে পারে।
আমরা প্রায়ই ফলাফল নিয়ন্ত্রণ করতে না পারার কারণে উদ্বিগ্ন হই। কিন্তু মানুষের হাতে ফলাফল নেই; মানুষের হাতে আছে চেষ্টা।
তাওয়াক্কুল সেই সীমারেখাটি পরিষ্কার করে।
—
যখন সত্যের মূল্য ছিল সবকিছুর চেয়ে বেশি
মহানবী (সা.)-এর তাওয়াক্কুলের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক ছিল সত্যের প্রশ্নে তাঁর আপসহীনতা।
পার্থিব সুবিধা যদি সত্যের বিনিময়ে পাওয়া যায়, তবে সেই সুবিধা তাঁর কাছে মূল্যহীন।
মুসায়লিমা কাযযাবের ঘটনাবলি এই নীতির একটি তাৎপর্যপূর্ণ দৃষ্টান্ত হিসেবে স্মরণ করা হয়। রাজনৈতিক শক্তি, সম্ভাব্য সুবিধা কিংবা সাময়িক সমঝোতা—কোনোটিই তাঁকে সত্যের মূলনীতি থেকে বিচ্যুত করতে পারেনি।
কারণ তাওয়াক্কুলের মানুষ জানে:
সত্যের মূল্য মানুষের স্বীকৃতিতে নয়; সত্যের মূল্য আল্লাহর সন্তুষ্টিতে।
এই বিশ্বাসই একজন মানুষকে সংখ্যাগরিষ্ঠতার বিরুদ্ধে দাঁড়ানোর সাহস দেয়।
—
আধ্যাত্মিক স্বাধীনতা আসলে কী?
আমাদের সময়ে স্বাধীনতা বলতে সাধারণত বোঝানো হয়—আমার যা ইচ্ছা, আমি তা করতে পারি।
কিন্তু তাওয়াক্কুল স্বাধীনতার একটি ভিন্ন সংজ্ঞা দেয়।
আমি মানুষের প্রশংসার দাস নই।
আমি মানুষের ভয়ের দাস নই।
আমি সম্পদের দাস নই।
আমি ফলাফলের দাস নই।
আমার কর্তব্য আমি করব।
কিন্তু আমার হৃদয়ের চূড়ান্ত নির্ভরতা থাকবে আল্লাহর ওপর।
এটাই আধ্যাত্মিক স্বাধীনতা।
প্রতিশ্রুত মসীহ হযরত মির্যা গোলাম আহমদ (আ.)-এর শিক্ষায় পূর্ণ ভক্তি এবং আল্লাহর ওপর নির্ভরতা পরস্পর গভীরভাবে সম্পর্কিত। মানুষ যত বেশি আন্তরিকতার সঙ্গে নিজেকে স্রষ্টার কাছে সমর্পণ করে, ততই তার অন্তর পার্থিব নির্ভরতার শৃঙ্খল থেকে মুক্ত হয়।
—
আজকের পৃথিবীতে তাওয়াক্কুলের নতুন ভাষা
একবিংশ শতাব্দীর মানুষ হয়তো উটের দড়ি হাতে নিয়ে মরুভূমিতে দাঁড়িয়ে নেই।
কিন্তু তারও রয়েছে অসংখ্য অদৃশ্য দড়ি।
চাকরি হারানোর ভয়।
অর্থনৈতিক অনিশ্চয়তা।
সন্তানের ভবিষ্যৎ।
অসুস্থতার আশঙ্কা।
সামাজিক মর্যাদা হারানোর ভয়।
অন্যের স্বীকৃতি পাওয়ার আকাঙ্ক্ষা।
আর আছে এমন এক পৃথিবী, যেখানে আগামীকাল কী ঘটবে—তা কেউ জানে না।
এই বাস্তবতায় তাওয়াক্কুল কোনো অতীতের ধারণা নয়।
এটি এক ধরনের আধ্যাত্মিক রেজিলিয়েন্স—ঝড়ের মধ্যেও দাঁড়িয়ে থাকার ক্ষমতা।
তাওয়াক্কুল বলে না যে ঝড় আসবে না।
এটি বলে:
ঝড় এলেও তোমার হৃদয় যেন ভেঙে না পড়ে।
—
বিশ্বাসের আধুনিক সাক্ষ্য
এই শিক্ষা কেবল ইতিহাসের চরিত্রদের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়।
খুতবায় আলোচিত সমসাময়িক কয়েকটি জীবনও দেখায়, কীভাবে বিশ্বাস কঠিন বাস্তবতার মধ্যেও মানুষের চরিত্রকে দৃঢ় করতে পারে।
মির্যা সফদর মাহমুদের জীবন ও তাঁর মসজিদে যাওয়ার পথে প্রাণ হারানোর ঘটনা বিশ্বাসের জন্য আত্মত্যাগের এক বেদনাবিধুর দৃষ্টান্ত হিসেবে উঠে আসে।
আমাতুল আজিজের দীর্ঘ অসুস্থতা, অপবাদ এবং প্রতিকূলতার মধ্যেও ধৈর্য ও অন্যের দোষ গোপন রাখার মানসিকতা তাওয়াক্কুলের আরেকটি মানবিক রূপ প্রকাশ করে।
আর রশিদ আহমদ হায়াতের নিয়মিত ইবাদত ও আল্লাহর সঙ্গে সম্পর্ক মনে করিয়ে দেয়—তাওয়াক্কুল কেবল সংকটের সময়ের কোনো বিশেষ আচরণ নয়; এটি প্রতিদিনের জীবনচর্চা।
এই মানুষগুলো হয়তো ইতিহাসের বৃহৎ রাজনৈতিক মানচিত্র বদলে দেননি।
কিন্তু তাঁরা নিজেদের অন্তরের মানচিত্র বদলেছেন।
আর কখনো কখনো সেটিই সবচেয়ে বড় বিজয়।
—
শেষ পর্যন্ত মানুষ কীসের ওপর দাঁড়িয়ে থাকে?
সভ্যতা যত এগিয়েছে, মানুষের হাতে নিয়ন্ত্রণের উপায় তত বেড়েছে।
কিন্তু নিশ্চয়তা বাড়েনি।
বরং নতুন নতুন ক্ষমতার সঙ্গে জন্ম নিয়েছে নতুন নতুন ভয়।
আজ আমাদের কাছে এমন প্রযুক্তি আছে যা কয়েক সেকেন্ডে পৃথিবীর এক প্রান্তের খবর অন্য প্রান্তে পৌঁছে দেয়। কিন্তু সেই প্রযুক্তি আমাদের ভবিষ্যৎ সম্পর্কে নিশ্চয়তা দিতে পারে না।
আমরা আবহাওয়ার পূর্বাভাস দিতে পারি।
ভূমিকম্পের ঝুঁকি পরিমাপ করতে পারি।
বাজারের গতিপথ বিশ্লেষণ করতে পারি।
কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার মাধ্যমে ভবিষ্যৎ অনুমান করার চেষ্টা করতে পারি।
তবু জীবনের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্নগুলোর উত্তর আমাদের হাতে থাকে না।
সেখানেই তাওয়াক্কুলের প্রয়োজন।
এটি মানুষকে বাস্তবতা থেকে পালাতে শেখায় না।
বরং বাস্তবতার মুখোমুখি দাঁড়াতে শেখায়—চোখ খোলা রেখে, হাত কাজে রেখে এবং হৃদয় আল্লাহর ওপর রেখে।
—
একটি স্থির হৃদয়ের শিক্ষা
টিলফোর্ডের সেই শুক্রবারের খুতবার গভীরে তাই শুধু একটি ধর্মীয় পরিভাষার ব্যাখ্যা ছিল না।
ছিল মানুষের এক চিরন্তন প্রশ্নের উত্তর খোঁজা:
সবকিছু যখন অনিশ্চিত, তখন মানুষ কীভাবে শান্ত থাকবে?
মহানবী হযরত মুহাম্মাদ (সা.)-এর জীবন তার একটি উত্তর দেয়।
প্রচেষ্টা করো।
সত্যের ওপর অটল থাকো।
মানুষের জন্য কল্যাণকর হও।
নিজের কর্তব্য পালন করো।
কিন্তু হৃদয়ের ভার এমন কিছুর ওপর রেখো না, যা আজ আছে—কাল নেই।
কারণ সম্পদ চলে যেতে পারে।
ক্ষমতা বদলে যেতে পারে।
মানুষের প্রশংসা নীরব হয়ে যেতে পারে।
পরিকল্পনা ব্যর্থ হতে পারে।
কিন্তু আল্লাহর ওপর সত্যিকার নির্ভরতা মানুষকে এমন একটি আশ্রয় দেয়, যা পার্থিব পরিবর্তনের সঙ্গে পরিবর্তিত হয় না।
সম্ভবত তাওয়াক্কুলের সবচেয়ে সুন্দর সংজ্ঞা তাই কোনো দীর্ঘ দার্শনিক বাক্যে নয়।
বরং একটি ছোট বিশ্বাসে—
আমি আমার সাধ্য অনুযায়ী চেষ্টা করব।
তারপর আমার রবের ওপর ভরসা করব।
আর পৃথিবী যখন চারদিকে অস্থির হয়ে উঠবে, তখন হয়তো মানুষের সবচেয়ে বড় শক্তি হবে—পৃথিবীকে নিয়ন্ত্রণ করার ক্ষমতা নয়, বরং নিজের হৃদয়কে স্থির রাখার ক্ষমতা।
কারণ ঝড় থামার অপেক্ষা করা সবসময় সম্ভব নয়।
কখনো কখনো মানুষকে ঝড়ের মধ্যেই স্থির হয়ে দাঁড়াতে হয়।