
যেদিন সহমর্মিতা একটি ঠিকানা পেল
কোত দিভোয়ারের হৃদয়ে একটি হাসপাতাল—যেখানে চিকিৎসার পাশাপাশি গড়ে উঠছে আস্থা, দক্ষতা ও আগামী দিনের সক্ষমতা
এক্সক্লুসিভ আন্তর্জাতিক ফিচার
লেখক: সাঈফুল ইসলাম
১৪ সেপ্টেম্বর ২০২৬
আবিদজানের কোনো এক প্রান্তে হয়তো তখন ভোর হচ্ছে।
রাস্তার পাশে দোকানগুলো ধীরে ধীরে খুলছে। কেউ কাজে যাওয়ার জন্য বের হচ্ছেন। কোনো মা তার শিশুকে কোলে নিয়ে দাঁড়িয়ে আছেন। কোথাও একজন বাবা রাতভর অসুস্থ সন্তানের পাশে বসে আছেন।
জীবন এখানে খুব সাধারণ।
কিন্তু অসুস্থতা কখনো সাধারণ নয়।
বিশেষ করে তখন, যখন চিকিৎসার জন্য অনেক দূর যেতে হয়। যখন হাসপাতালের দরজায় পৌঁছাতে পৌঁছাতে সময় ফুরিয়ে যায়। যখন একটি অপারেশনের খরচ পুরো পরিবারের ভবিষ্যৎকে অনিশ্চিত করে তোলে।
চিকিৎসাবিজ্ঞানের ভাষায় এগুলো সংখ্যা।
একজন মায়ের জন্য এগুলো তার সন্তান।
একজন বাবার জন্য—তার পরিবার।
আর একজন অসুস্থ মানুষের জন্য—এগুলো তার নিজের জীবন।
আজ সেই গল্পের মধ্যে একটি নতুন অধ্যায় শুরু হচ্ছে।
আবিদজানের ইয়োপুগন-গেস্কোর মাহদিয়াবাদে আজ আনুষ্ঠানিকভাবে যাত্রা শুরু করছে মাসরুর সেন্টার ফর হেলথকেয়ার।
Humanity First-এর এই নতুন হাসপাতালটি জরুরি চিকিৎসা, মাতৃ ও নবজাতক সেবা, নিবিড় পরিচর্যা, সার্জারি, রোগ নির্ণয় এবং বিভিন্ন বিশেষায়িত চিকিৎসাকে একই প্রতিষ্ঠানের মধ্যে নিয়ে আসার লক্ষ্য নিয়ে তৈরি হয়েছে।
কিন্তু ভবনটির গল্প শুধু ইট-পাথর আর চিকিৎসা-যন্ত্রের গল্প নয়।
এর ভেতরে লুকিয়ে আছে আরও বড় একটি প্রশ্ন—
মানুষকে সাহায্য করা কি শুধু আজকের কষ্ট কমানো?
নাকি সত্যিকারের মানবসেবা হলো এমন কিছু তৈরি করে যাওয়া, যা আগামীকালও মানুষের পাশে দাঁড়াবে?
একটি হাসপাতাল, কিন্তু গল্পটি আরও বড়
কোনো হাসপাতাল নির্মাণের খবর শুনলে আমরা সাধারণত ভবনের কথা ভাবি।
কতটি শয্যা?
কতটি অপারেশন থিয়েটার?
কী কী যন্ত্রপাতি?
কতজন রোগী চিকিৎসা পাবেন?
এসব গুরুত্বপূর্ণ।
কিন্তু একটি হাসপাতালের আসল গল্প কখনো যন্ত্রপাতিতে শেষ হয় না।
গল্পটি শুরু হয় তখন, যখন প্রথম অসহায় মানুষটি দরজা দিয়ে ভেতরে ঢোকেন।
মাসরুর সেন্টারের ক্ষেত্রেও তাই।
ইয়োপুগন-গেস্কো আবিদজানের বৃহত্তর জনবসতির সঙ্গে যুক্ত একটি গুরুত্বপূর্ণ এলাকা। হাসপাতালটির অবস্থান এমন একটি জনগোষ্ঠীর কাছে চিকিৎসা পৌঁছে দেওয়ার উদ্দেশ্যেই বেছে নেওয়া হয়েছে, যাদের জন্য উন্নত চিকিৎসার সুযোগ সবসময় সহজলভ্য নয়।
Humanity First-এর নিজস্ব তথ্য অনুযায়ী, হাসপাতালটিতে থাকবে পাঁচ শয্যার জরুরি বিভাগ, তিনটি মাতৃসেবা স্যুট, নবজাতক পরিচর্যা, চার শয্যার আইসিইউ, দুটি অপারেশন থিয়েটার এবং একাধিক রোগ নির্ণয় সুবিধা।
কাগজে এগুলো কিছু সংখ্যা।
বাস্তবে?
একটি পাঁচ শয্যার জরুরি বিভাগ মানে হয়তো কোনো এক রাতে পাঁচটি পরিবার নতুন করে আশার আলো দেখতে পারে।
একটি অপারেশন থিয়েটার মানে হয়তো কোনো মায়ের জন্য সময়মতো সিজারিয়ান অপারেশন।
একটি নবজাতক ইউনিট মানে হয়তো খুব ছোট্ট একটি শিশুর জন্য পৃথিবীতে থাকার আরেকটি সুযোগ।
আর একটি আইসিইউ?
কখনো কখনো সেটিই জীবন আর মৃত্যুর মাঝখানের শেষ সেতু।
শুরুটা হয়েছিল অনেক আগে
আজকের ঝকঝকে হাসপাতালটি একদিনে তৈরি হয়নি।
এর গল্পের শুরু আরও আগে।
২০১৮ সালের দিকে প্রকল্পটির প্রাথমিক কাজ শুরু হয়। পরবর্তীতে ২৭ নভেম্বর ২০২১ সালে হাসপাতালের ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপন করা হয়।
তারপর কেটে গেছে বছর।
কেউ বাইরে থেকে হয়তো শুধু একটি ভবন দেখেছেন।
কিন্তু একটি হাসপাতাল তৈরি করতে ভবনের চেয়ে অনেক বেশি কিছু লাগে।
বিদ্যুৎ।
পানি।
মেডিকেল গ্যাস।
সংক্রমণ নিয়ন্ত্রণ।
অপারেশন থিয়েটার।
ডায়াগনস্টিক যন্ত্রপাতি।
চিকিৎসা-আসবাব।
প্রশিক্ষিত মানুষ।
আর সবচেয়ে বেশি লাগে—ধৈর্য।
Humanity First-এর তথ্য অনুযায়ী, মূল ভবনের কাজ শেষ হওয়ার পর দীর্ঘ সময় ধরে অভ্যন্তরীণ অবকাঠামো, সংক্রমণ নিয়ন্ত্রণের ব্যবস্থা এবং অন্যান্য প্রয়োজনীয় প্রস্তুতির কাজ চলেছে।
এই অংশটির কোনো উদ্বোধনী ছবি হয় না।
কেউ ফিতা কাটেন না।
কেউ হাততালি দেন না।
কিন্তু হাসপাতাল তৈরির আসল ইতিহাস অনেক সময় সেখানেই লেখা হয়।
নীরবে।
দিনের পর দিন।
বছরের পর বছর।
তারপর আসে ১৪ সেপ্টেম্বর
আর আজ—
১৪ সেপ্টেম্বর ২০২৬।
অপেক্ষার শেষ দিন।
মাহদিয়াবাদে অতিথিরা আসছেন।
বিশ্বের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে মানুষ জড়ো হচ্ছেন।
ইয়োপুগন-গেস্কোতে সাজ সাজ রব।
একটি হাসপাতাল প্রস্তুত।
দরজাগুলো খুলতে যাচ্ছে।
Humanity First জানিয়েছে, এই উদ্বোধনের মধ্য দিয়ে কেন্দ্রটি স্থানীয় জনগোষ্ঠীর জন্য accessible এবং sustainable healthcare-এর একটি নতুন অধ্যায় শুরু করবে।
কিন্তু উদ্বোধনের সবচেয়ে সুন্দর মুহূর্ত হয়তো মঞ্চে হবে না।
হয়তো হবে কোনো একদিন—
যখন প্রথম কোনো মা তার নবজাতককে কোলে নিয়ে হাসপাতাল থেকে বাড়ি ফিরবেন।
চিকিৎসা যখন আরও কাছে আসে
অসুস্থতার সময় মানুষ দূরত্বের হিসাব করে না।
সে শুধু চায়—কেউ তাকে সাহায্য করুক।
একজন রোগী হয়তো কার্ডিওলজিস্টের কাছে যেতে চান।
কেউ চোখের চিকিৎসা চান।
কেউ ডায়ালাইসিস চান।
কেউ সার্জারির জন্য অপেক্ষা করছেন।
কোনো শিশুর দরকার বিশেষজ্ঞ চিকিৎসা।
কোনো মায়ের দরকার নিরাপদ প্রসব।
মাসরুর সেন্টারের পরিকল্পনায় কার্ডিওলজি, গ্যাস্ট্রোএন্টারোলজি, শিশু চিকিৎসা, জেনারেল সার্জারি, চক্ষু চিকিৎসা, দন্ত চিকিৎসা, ইউরোলজি এবং ডায়ালাইসিসসহ বিভিন্ন সেবা অন্তর্ভুক্ত রয়েছে।
রয়েছে এক্স-রে।
আল্ট্রাসাউন্ড।
ইসিজি।
এন্ডোস্কোপি।
ল্যাবরেটরি।
ফার্মেসি।
অর্থাৎ একটি রোগীকে শুধু একটি কক্ষ দেওয়া হচ্ছে না।
তাকে একটি চিকিৎসা-ব্যবস্থার ভেতরে প্রবেশের সুযোগ দেওয়া হচ্ছে।
কিন্তু হাসপাতালের সবচেয়ে মূল্যবান যন্ত্রটি কোনটি?
একটু থামুন।
এতক্ষণ আমরা ভবনের কথা বললাম।
যন্ত্রপাতির কথা বললাম।
শয্যার কথা বললাম।
এবার অন্য একটি প্রশ্ন করা যাক।
হাসপাতালের সবচেয়ে মূল্যবান সম্পদ কী?
এক্স-রে মেশিন?
আইসিইউ?
অপারেশন থিয়েটার?
না।
মানুষ।
একজন দক্ষ ডাক্তার।
একজন যত্নশীল নার্স।
একজন অভিজ্ঞ মিডওয়াইফ।
একজন দক্ষ ল্যাবরেটরি টেকনিশিয়ান।
একজন এমন প্রশাসনিক কর্মী, যিনি জানেন—তার সামনে থাকা মানুষটি কোনো ফাইল নম্বর নয়; তিনি একজন মানুষ।
এই কারণেই স্থানীয় জনবল এবং প্রশিক্ষণের বিষয়টি এত গুরুত্বপূর্ণ।
Humanity First-এর পরিকল্পনায় স্থানীয় জনগোষ্ঠীর জন্য চাকরি ও প্রশিক্ষণ সৃষ্টি এবং চিকিৎসা দক্ষতা বিকাশকে প্রকল্পটির স্থায়িত্বের একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ হিসেবে রাখা হয়েছে।
একজন বিদেশি চিকিৎসক এসে কিছু রোগী চিকিৎসা করতে পারেন।
কিন্তু একজন স্থানীয় চিকিৎসককে প্রশিক্ষণ দিলে?
তিনি বছরের পর বছর মানুষের পাশে থাকবেন।
একজন নার্সকে দক্ষ করে তুললে?
তিনি শত শত পরিবারকে সেবা দেবেন।
একজন মিডওয়াইফকে প্রশিক্ষণ দিলে?
হয়তো বহু মা নিরাপদে সন্তান জন্ম দেবেন।
এটাই পার্থক্য—
ত্রাণ সাহায্য করে একজনকে।
সক্ষমতা সাহায্য করে একটি প্রজন্মকে।
মানবিকতার নতুন সংজ্ঞা
মানবিকতা শব্দটি শুনলে আমরা অনেক সময় খাবার বিতরণ, ওষুধ দেওয়া বা জরুরি ত্রাণের ছবি দেখি।
সেগুলো অবশ্যই মানবসেবা।
কিন্তু মানবসেবার আরেকটি গভীর রূপ আছে।
কাউকে এমন অবস্থানে নিয়ে যাওয়া, যেখানে সে নিজেই আগামী দিনের সমস্যা মোকাবিলা করতে পারে।
একটি হাসপাতাল যদি শুধু রোগী দেখে, সেটি একটি চিকিৎসাকেন্দ্র।
কিন্তু একটি হাসপাতাল যদি চিকিৎসকের দক্ষতা বাড়ায়, নার্সকে প্রশিক্ষণ দেয়, স্থানীয় কর্মসংস্থান সৃষ্টি করে, রোগ নির্ণয়ের সুযোগ বাড়ায় এবং দীর্ঘমেয়াদে নিজের কার্যক্রম টিকিয়ে রাখতে পারে—
তখন সেটি শুধু হাসপাতাল থাকে না।
সেটি হয়ে ওঠে একটি প্রতিষ্ঠান।
একটি প্রতিষ্ঠান সমাজকে বদলাতে পারে।
টেকসই হওয়ার আরেকটি গল্প
মানবিক প্রকল্পের একটি পুরোনো প্রশ্ন আছে—
অনুদান কতদিন চলবে?
আজ মানুষ দান করল।
আগামীকাল করল।
তারপর?
এই প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে গিয়ে মাসরুর সেন্টারের পরিকল্পনায় পরিবেশ, সামাজিক ন্যায় এবং অর্থনৈতিক স্থায়িত্ব—এই তিনটি বিষয়কে গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। প্রাকৃতিক আলো, সবুজ স্থান এবং শক্তি-সাশ্রয়ী নকশা ব্যবহারের পাশাপাশি স্থানীয় কর্মসংস্থান ও প্রশিক্ষণকে গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে।
সাম্প্রতিক প্রকল্পের তথ্য অনুযায়ী, সৌরশক্তিও হাসপাতালের বিদ্যুৎব্যবস্থার একটি অংশ হিসেবে অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে।
এখানে একটি সুন্দর ধারণা কাজ করছে।
দান একটি হাসপাতাল তৈরি করতে পারে।
কিন্তু একটি টেকসই প্রতিষ্ঠান হাসপাতালটিকে বাঁচিয়ে রাখতে পারে।
আফ্রিকার স্বাস্থ্যব্যবস্থার বদলে যাওয়া বাস্তবতা
আফ্রিকার স্বাস্থ্যচিত্র একেবারে বদলে যাচ্ছে।
একদিকে ম্যালেরিয়া।
মাতৃমৃত্যু।
শিশুমৃত্যু।
সংক্রামক রোগ।
অন্যদিকে ডায়াবেটিস।
উচ্চ রক্তচাপ।
হৃদ্রোগ।
ক্যান্সার।
কিডনি রোগ।
অর্থাৎ আজকের হাসপাতালকে একই সঙ্গে দুই পৃথিবীর রোগের মোকাবিলা করতে হচ্ছে।
পুরোনো ধারণা দিয়ে নতুন বাস্তবতাকে বোঝা যাচ্ছে না।
তাই দরকার এমন স্বাস্থ্যব্যবস্থা, যা একদিকে জরুরি চিকিৎসা দিতে পারে, অন্যদিকে দীর্ঘমেয়াদি রোগের চিকিৎসাও করতে পারে।
মাসরুর সেন্টারের পরিকল্পনাটি এই দুই প্রয়োজনকে একই ছাদের নিচে আনার চেষ্টা করছে।
একটি শিশুর চোখ দিয়ে দেখুন
ধরুন, একটি শিশু হাসপাতালে এসেছে।
সে জানে না হাসপাতাল কী।
সে জানে না “সেকেন্ডারি কেয়ার” কী।
সে জানে না “টারশিয়ারি কেয়ার” কী।
সে শুধু জানে—
মা তাকে শক্ত করে ধরে আছেন।
বাবা চিন্তিত।
চারপাশে অচেনা মানুষ।
আর সে অসুস্থ।
তার কাছে হাসপাতাল মানে একটি মাত্র জিনিস—
কেউ কি আমাকে ভালো করে দেবে?
এই প্রশ্নের উত্তর কোনো পরিসংখ্যানে নেই।
কোনো রিপোর্টে নেই।
কোনো উদ্বোধনী বক্তৃতাতেও নেই।
উত্তরটি পাওয়া যাবে একজন চিকিৎসকের হাতে।
একজন নার্সের কণ্ঠে।
একজন মায়ের চোখের স্বস্তিতে।
একটি শিশুর ফিরে পাওয়া হাসিতে।
একটি হাসপাতালের আসল সাফল্য
হয়তো দশ বছর পর কেউ আজকের উদ্বোধনের কথা মনে রাখবে না।
ফিতা কাটা, বক্তৃতা, ছবি—সবই ইতিহাস হয়ে যাবে।
কিন্তু যদি তখন কোনো স্থানীয় চিকিৎসক বলেন—
“আমি এই হাসপাতালেই প্রশিক্ষণ পেয়েছিলাম।”
যদি কোনো নার্স বলেন—
“এখানেই আমি আমার পেশা শিখেছি।”
যদি কোনো মা বলেন—
“আমার সন্তানকে এখানেই বাঁচানো হয়েছিল।”
যদি কোনো পরিবার বলে—
“আমাদের চিকিৎসার জন্য আর শহরের অন্য প্রান্তে ছুটতে হয়নি।”
তাহলে বুঝতে হবে—
হাসপাতালটি সফল হয়েছে।
কারণ হাসপাতালের সাফল্য তার দেয়ালের উচ্চতায় নয়।
তার সাফল্য মানুষের জীবনে।
সহমর্মিতা যখন একটি ঠিকানা পায়
মানবিকতার সবচেয়ে সুন্দর দৃশ্য সম্ভবত এমনই।
কেউ দূরদেশে বসে সাহায্য করেন।
কেউ অর্থ দেন।
কেউ সময় দেন।
কেউ চিকিৎসাবিদ্যা দেন।
কেউ প্রকৌশল জ্ঞান দেন।
কেউ শ্রম দেন।
কেউ একটি ছোট অনুদান দেন।
কেউ হয়তো শুধু বলেন—
“আমি চাই, মানুষটি ভালো থাকুক।”
এই ছোট ছোট ইচ্ছা একদিন একসঙ্গে হয়ে একটি হাসপাতাল তৈরি করে।
একটি হাসপাতাল তখন শুধু কংক্রিটের ভবন নয়।
এটি হয়ে ওঠে বহু মানুষের সম্মিলিত ভালোবাসার দৃশ্যমান রূপ।
আগামী দিনের দিকে তাকিয়ে
মাসরুর সেন্টারের গল্প এখনো শেষ হয়নি।
বরং আজ থেকেই শুরু।
কারণ হাসপাতাল নির্মাণের কাজ শেষ হতে পারে।
কিন্তু মানুষের সেবা করার কাজ কখনো শেষ হয় না।
আজ জরুরি বিভাগে একজন রোগী আসবেন।
আগামীকাল একজন মা।
তার পরদিন হয়তো কোনো শিশু।
কেউ সুস্থ হয়ে ফিরবেন।
কেউ দীর্ঘ চিকিৎসার পথে যাবেন।
কেউ হয়তো জীবনের সবচেয়ে কঠিন মুহূর্তে এখানে এসে দাঁড়াবেন।
আর প্রতিবারই হাসপাতালটিকে একই প্রশ্নের উত্তর দিতে হবে
“তুমি কি আমার পাশে আছ?”
একটি টেকসই মানবিক প্রতিষ্ঠান সেই প্রশ্নের উত্তর দেবে—
“হ্যাঁ।”
ভবিষ্যতের জন্য একটি দরজা
১৪ সেপ্টেম্বর ২০২৬-এর এই দিনটি তাই শুধু একটি হাসপাতালের উদ্বোধনের দিন নয়।
এটি একটি ধারণারও উদ্বোধন।
এই ধারণা বলে—
মানবসেবা শুধু বিপদের সময় ছুটে যাওয়া নয়।
মানবসেবা হলো এমন কিছু নির্মাণ করা, যা বিপদ আসার আগেই মানুষকে শক্তিশালী করে।
শুধু ওষুধ দেওয়া নয়।
চিকিৎসক তৈরি করা।
শুধু রোগী দেখা নয়।
স্বাস্থ্যব্যবস্থা তৈরি করা।
শুধু আজকের জীবন বাঁচানো নয়।
আগামী দিনের জীবনকে নিরাপদ করা।
এবং হয়তো এখানেই এই হাসপাতালের সবচেয়ে বড় গল্পটি লুকিয়ে আছে।
সহমর্মিতা যখন হাতে হাত রাখে, তখন তা শুধু অশ্রু মুছে দেয় না।
সে রাস্তা তৈরি করে।
সে ঘর তৈরি করে।
সে হাসপাতাল তৈরি করে।
আর কখনো কখনো—
সে একটি পুরো সমাজকে নতুন করে বাঁচতে শেখায়।
শেষ দৃশ্য
সূর্য ধীরে ধীরে আবিদজানের আকাশে নামছে।
হাসপাতালের জানালায় আলো জ্বলছে।
একজন নার্স করিডোর দিয়ে হাঁটছেন।
কোনো এক কক্ষে একজন চিকিৎসক প্রস্তুতি নিচ্ছেন।
কোথাও হয়তো একটি শিশুর কান্না শোনা যাচ্ছে।
কোনো মা তার শিশুকে বুকের কাছে টেনে নিয়েছেন।
বাইরে শহর তার স্বাভাবিক জীবনে ফিরে যাচ্ছে।
কিন্তু এই ভবনের ভেতর আজ একটি নতুন গল্প শুরু হয়েছে।
একটি গল্প—
জীবনের।
আশার।
মানবিকতার।
এবং সেই বিশ্বাসের—
যে পৃথিবীকে একটু ভালো করা যায়।
একজন মানুষ দিয়ে।
একটি সেবা দিয়ে।
একটি হাসপাতাল দিয়ে।
একটি জীবন বাঁচানো মানে একটি পরিবারকে বাঁচানো।
আর একটি টেকসই স্বাস্থ্যপ্রতিষ্ঠান গড়ে তোলা মানে—একটি সমাজের ভবিষ্যতের পাশে দাঁড়ানো।
আজ, কোত দিভোয়ারে, সহমর্মিতা শুধু একটি অনুভূতি নয়।
সহমর্মিতা আজ একটি ঠিকানা পেয়েছে।
— সাঈফুল ইসলাম
১৪ সেপ্টেম্বর ২০২৬