ডাইনোসরের আগে: ছিল অন্য এক রাজার রাজত্ব

আর্জেন্টিনায় আবিষ্কৃত ছয় মিটার দীর্ঘ শিকারি Shakajlura riojanensis খুলে দিচ্ছে ট্রায়াসিক যুগের এক বিস্মৃত পৃথিবীর দরজা—যেখানে ডাইনোসর নয়, কুমির-বংশীয় আর্কোসররাই খাদ্যশৃঙ্খলের শীর্ষে ছিল।

লেখক: সাঈফুল ইসলাম
বিজ্ঞান | জীবাশ্মবিদ্যা | জুন ২০২৬


ডাইনোসরের আগের পৃথিবী

ডাইনোসরের যুগ আমাদের কল্পনায় এত গভীরভাবে গেঁথে আছে যে একটি বিস্ময়কর সত্য আমরা সহজেই ভুলে যাই—

কয়েক কোটি বছর ধরে ডাইনোসররা পৃথিবীর শাসক ছিল না।

প্রায় ২৩ কোটি ৭০ লাখ বছর আগে, আজকের উত্তর-পশ্চিম আর্জেন্টিনার যে ভূখণ্ড, সেখানে রাজত্ব ছিল অন্য এক বংশের।

ছিল নদী। ছিল বিস্তীর্ণ বন্যাভূমি। দক্ষিণ প্যাঙ্গিয়ার আকাশে ভেসে বেড়াত আগ্নেয়গিরির ছাই। গাছপালার ভেতর দিয়ে চলাফেরা করত স্তন্যপায়ী প্রাণীদের দূরবর্তী আত্মীয়রা। প্রাথমিক ডাইনোসররাও পৃথিবীতে এসেছিল—তবে তারা তখনও তুলনামূলকভাবে ছোট।

আর সেই পৃথিবীর বড় শিকারিদের একজন ছিল এমন এক প্রাণী, বিবর্তনের বিচারে যার সঙ্গে আজকের কুমিরের আত্মীয়তা ডাইনোসরের চেয়েও ঘনিষ্ঠ।

তার নাম—Shakajlura riojanensis

নামটির আনুমানিক অর্থ—“লা রিওহার আশীর্বাদপুষ্ট টিকটিকি।”

নামটি অদ্ভুত সুন্দর।

প্রাণীটি ছিল আরও বিস্ময়কর।

গবেষকদের অনুমান, Shakajlura প্রায় ছয় মিটার—অর্থাৎ প্রায় ২০ ফুট—লম্বা হতে পারত। তার খুলি ছিল প্রায় ৬০ সেন্টিমিটার। এটি ডাইনোসর ছিল না। এটি ছিল paracrocodylomorph pseudosuchian—আর্কোসর পরিবারের সেই শাখার সদস্য, যে শাখা শেষ পর্যন্ত আধুনিক কুমিরদের জন্ম দিয়েছে।

আর এই আবিষ্কার বদলে দিচ্ছে ডাইনোসরের দৈত্যে পরিণত হওয়ার আগের পৃথিবীর একটি পরিচিত ছবি।


I. আগ্নেয় ছাইয়ের নিচে চাপা পড়া এক খুলি

গল্পটির শুরু আর্জেন্টিনার লা রিওহা প্রদেশের দুর্গম, খরখরে ভূমিতে। আজ যে অঞ্চলটি Talampaya National Park-এর সুরক্ষায় রয়েছে, তারই প্রাচীন শিলাস্তরে লুকিয়ে ছিল রহস্যটি।

২০১৭ ও ২০১৮ সালের জীবাশ্ম অনুসন্ধান অভিযানে Archosauriform Research Group-এর গবেষকেরা Chañares Formation থেকে একগুচ্ছ জীবাশ্ম হাড় উদ্ধার করেন।

নমুনাটির ক্যাটালগ নম্বর—CRILAR-Pv 572

এর মধ্যে ছিল খুলির বেশ কিছু অংশ এবং শরীরের আরও কয়েকটি হাড়।

পুরো কঙ্কাল নয়।

আর ঠিক এখানেই আবিষ্কারটির বিস্ময়।

একটি ভাঙাচোরা খুলি, চোয়াল, দাঁত এবং কঙ্কালের কিছু অংশ দেখে গবেষকেরা এমন এক প্রাণীকে শনাক্ত করতে সক্ষম হন, যা আগে পরিচিত কোনো প্রজাতির সঙ্গে সহজে মেলানো যাচ্ছিল না।

২০২৬ সালের জুনে Ariel F. Cardillo এবং তাঁর সহকর্মীরা Papers in Palaeontology-তে আনুষ্ঠানিকভাবে প্রাণীটির নাম দেন Shakajlura riojanensis

গণিতের মতো নিখুঁত এই নামেরও একটি গল্প আছে।

গণনা ভাষা থেকে shakaj অর্থ “আশীর্বাদপুষ্ট”, আর lura অর্থ “টিকটিকি”। আর riojanensis নামটি এসেছে লা রিওহা প্রদেশের নাম থেকে—যেখানে জীবাশ্মটি পাওয়া গেছে।

এটি শুধু জীবাশ্মবিদ্যার তালিকায় আরেকটি নতুন নাম নয়।

এটি এমন এক পৃথিবীর জানালা—

যে পৃথিবীতে Tyrannosaurus rex জন্ম নেওয়ারও বহু কোটি বছর বাকি।


II. পরিচয় হোক ছয় মিটার দীর্ঘ শিকারির সঙ্গে

এক মুহূর্তের জন্য নিজেকে নিয়ে যান ট্রায়াসিক যুগের একটি বন্যাপ্রবণ সমতলে।

সেখানে নেই T. rex

নেই Velociraptor

নেই বিশাল থেরোপডদের দল, যারা পরে ডাইনোসরের পৃথিবীর ভয়ংকর শিকারি হয়ে উঠবে।

তার বদলে প্রাচীন ভূদৃশ্যের ওপর দিয়ে এগিয়ে যাচ্ছে প্রায় ছয় মিটার দীর্ঘ একটি প্রাণী।

তার শরীরের প্রতিটি বিবরণ আমরা জানি না। কিন্তু তার হাড়গুলো বলে দেয়—এই প্রাণীটি এমন এক জীবনযাপনের জন্য তৈরি ছিল, যেখানে সে তার পরিবেশের অন্যতম প্রধান শিকারি।

তার চোয়ালে ছিল পাশ থেকে চাপা ধরনের দাঁত—মাংসাশী জীবনের সঙ্গে মানানসই।

আর তার খুলিতে ছিল এমন কিছু বৈশিষ্ট্যের অনন্য সমন্বয়, যা আগে পরিচিত কোনো pseudosuchian-এর সঙ্গে পুরোপুরি মেলে না।

গবেষকেরা Shakajlura-কে তার নিকটাত্মীয়দের থেকে আলাদা করে এমন বেশ কিছু বৈশিষ্ট্য শনাক্ত করেছেন।

উপরের চোয়ালে ছিল না কিছু কুমির-বংশীয় আর্কোসরের মতো স্পষ্ট পৃষ্ঠীয় অলংকরণ।

নাসার হাড় ছিল তুলনামূলকভাবে সোজা।

আর খুলিতে ছিল jugal হাড়ের একটি স্বতন্ত্র মধ্যবর্তী shelf, quadrate-এর ascending process-এ একটি incision এবং অস্বাভাবিকভাবে বড় prearticular bone।

শুনতে হয়তো খুব ছোটখাটো বিষয় মনে হয়।

কিন্তু জীবাশ্মবিদ্যার জগতে—

এগুলোই অনেক সময় সবকিছু।

একটি হাড়ের কিনারা।

একটি ছোট shelf।

চোখের চারপাশের হাড়ের আকৃতি।

কখনো কখনো ২৩ কোটিরও বেশি বছর আগে হারিয়ে যাওয়া একটি প্রাণীর পরিচয় লুকিয়ে থাকে ঠিক এই সামান্য খুঁটিনাটির মধ্যে।


III. আরেক দৈত্য

তবে Shakajlura কোনো শূন্য পৃথিবীতে বাস করত না।

প্রায় একই সময়ে, একই বিস্তৃত বাস্তুতন্ত্রে বাস করত আরেক বিশাল কুমির-বংশীয় শিকারি—

Luperosuchus fractus

এখানেই আবিষ্কারটি আরও আকর্ষণীয় হয়ে ওঠে।

দুই প্রাণীর আকার ছিল মোটামুটি কাছাকাছি। কিন্তু তাদের খুলি এক রকম ছিল না।

Luperosuchus-এর নাসার অঞ্চলে ছিল একটি স্বতন্ত্র ঊর্ধ্বমুখী বাঁক—যাকে গবেষকেরা অনানুষ্ঠানিকভাবে এক ধরনের “রোমান নাক” বলে বর্ণনা করেছেন।

Shakajlura-র ক্ষেত্রে সেটি ছিল না।

তার মুখ তুলনামূলকভাবে সোজা।

উপরের চোয়ালের অলংকরণ এবং চোখের চারপাশের গঠনেও ছিল পার্থক্য।

এসব পার্থক্য একাই প্রমাণ করে না যে দুই প্রাণী সম্পূর্ণ আলাদা পরিবেশগত ভূমিকা পালন করত।

তবে একটি বিষয় স্পষ্ট করে—

ট্রায়াসিকের শিকারি সমাজ কোনো এক দৈত্যের একচ্ছত্র রাজ্য ছিল না।

Chañares Formation ছিল এমন এক বাস্তুতন্ত্র, যেখানে একাধিক বৃহৎ আকারের আর্কোসর পাশাপাশি বাস করত।

প্রত্যেকের শরীরে ছিল নিজের বিবর্তনের আলাদা গল্প।


IV. যখন কুমির-বংশীয় প্রাণীরা স্থলভাগ শাসন করত

“কুমির”—শব্দটি এখানে একটু বিভ্রান্ত করতে পারে।

Shakajlura কোনো বিশাল আধুনিক কুমির ছিল না।

এটি ছিল আর্কোসর পরিবারের আরও বিস্তৃত একটি শাখা—pseudosuchianদের সদস্য। এই বংশধারার মধ্যেই আজকের কুমিরেরা টিকে আছে।

ট্রায়াসিক যুগে এই বংশধারা অবিশ্বাস্য রকমের বৈচিত্র্য তৈরি করেছিল।

কেউ ছিল ছোট।

কেউ ছিল বর্মে আবৃত।

কেউ বাস করত পানিতে বা পানির কাছাকাছি।

আর কেউ কেউ হয়ে উঠেছিল বিশাল স্থলচর শিকারি।

গবেষকেরা Shakajlura-কে Chañares Formation থেকে পরিচিত অন্যতম শীর্ষ শিকারি হিসেবে বর্ণনা করেছেন।

এর উপস্থিতি এমন এক প্রাণীসমাজে আরও একটি বৃহৎ শিকারির অস্তিত্বের প্রমাণ দেয়, যে সময়টি ছিল আর্কোসরদের বিবর্তনের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।

কারণ ট্রায়াসিক যুগ কেবল ডাইনোসরের যুগের পূর্বকথা ছিল না।

এটি ছিল বিবর্তনের এক বিশাল পরীক্ষা।

পার্মিয়ান যুগের শেষের মহাবিলুপ্তির পর পৃথিবীর বাস্তুতন্ত্রগুলো আবার গড়ে উঠছিল।

বিভিন্ন প্রাণীগোষ্ঠী নতুন পরিবেশগত স্থান দখলের জন্য প্রতিযোগিতা করছিল।

স্তন্যপায়ী প্রাণীদের পূর্বপুরুষের বংশধর, কুমির-বংশীয় আর্কোসর এবং প্রাথমিক ডাইনোসর—সবাই এগিয়ে যাচ্ছিল নিজেদের আলাদা বিবর্তনীয় পথে।

ভবিষ্যৎ তখনও ঠিক হয়ে যায়নি।


V. ডাইনোসররা ছিল—কিন্তু তারা তখনও দৈত্য নয়

জনপ্রিয় কল্পনায় ট্রায়াসিক যুগের সবচেয়ে বড় সংশোধন সম্ভবত এটাই।

প্রথম ডাইনোসররা ইতিমধ্যেই পৃথিবীতে এসেছিল।

কিন্তু যে বিশাল শিকারি ডাইনোসররা পরে আমাদের কল্পনাকে দখল করবে, তারা তখনও আসেনি।

Chañares-এর বাস্তুতন্ত্রে ছোট আকারের ডাইনোসর ও তাদের আত্মীয়রা একই ভূদৃশ্য ভাগ করে নিত অনেক বড় কুমির-বংশীয় শিকারিদের সঙ্গে।

আর এই বৈপরীত্যই Shakajlura-কে এত গুরুত্বপূর্ণ করে তোলে।

বিবর্তন কোনো পূর্বনির্ধারিত চিত্রনাট্য অনুসরণ করে না।

ডাইনোসরই শেষ পর্যন্ত পৃথিবীর বৃহৎ স্থলচর শিকারিদের প্রধান বংশ হয়ে উঠবে—এমন কোনো নিশ্চয়তা তখন ছিল না।

কিছু সময়ের জন্য আর্কোসর পরিবারের অন্য একটি শাখাই সেই পরিবেশগত আসন দখল করে রেখেছিল।

পৃথিবীর ভবিষ্যৎ তখনও লেখা হচ্ছিল—

একটি প্রজাতি,

একটি পরিবেশ,

একটি বিলুপ্তি করে।


VI. হারিয়ে যাওয়া পৃথিবীর একটি নাম

Shakajlura নামটির মধ্যে যেন এক ধরনের কবিতা আছে।

“আশীর্বাদপুষ্ট টিকটিকি।”

২৩ কোটিরও বেশি বছর আগে হারিয়ে যাওয়া একটি প্রাণীর নাম এটি।

লা রিওহার পাথরের ভেতরে রেখে গিয়েছিল সে তার শরীরের কিছু হাড়।

সেই হাড় টিকে গেছে আগ্নেয়গিরির অগ্ন্যুৎপাত, মাটির নিচে চাপা পড়া, ক্ষয় এবং কল্পনাতীত দীর্ঘ ভূতাত্ত্বিক সময়ের বিরুদ্ধে।

তারপর—

২০১৭ ও ২০১৮ সালে মানুষের হাত সেই হাড়গুলো তুলে আনল মাটির বুক থেকে।

বিজ্ঞানীরা সেগুলো পরিষ্কার করলেন।

মাপলেন।

তুলনা করলেন।

বিবর্তনীয় বিশ্লেষণে বসালেন।

আর অবশেষে সেই ভাঙা টুকরোগুলো থেকেই পুনর্গঠিত হলো এমন এক প্রাণী, যার কোনো অস্তিত্ব এতদিন বৈজ্ঞানিক নথিতে ছিল না।

প্রাণীটি নেই।

কিন্তু তার হাড় আছে।

আর সেই হাড়ের ভেতর দিয়ে ট্রায়াসিক যুগ যেন আজও একটি কথা বলে—

ডাইনোসর আসার অপেক্ষায় পৃথিবী বসে ছিল না।

তার নিজের রাজা তখনই ছিল।


বড় গল্পটি আসলে কী?

Shakajlura riojanensis-এর গুরুত্ব ছয় মিটার দীর্ঘ একটি শিকারির আবিষ্কারের মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়।

Chañares Formation পৃথিবীর গুরুত্বপূর্ণ ট্রায়াসিক জীবাশ্মভাণ্ডারগুলোর একটি। এখানে সংরক্ষিত রয়েছে স্তন্যপায়ী প্রাণীদের পূর্বপুরুষের আত্মীয়, প্রাথমিক ডাইনোসর ও তাদের আত্মীয়, কুমির-বংশীয় আর্কোসর এবং আরও বহু প্রাণীর অস্তিত্বের চিহ্ন—যারা পৃথিবীর সবচেয়ে বড় গণবিলুপ্তির পর নতুন পৃথিবীতে জীবন ফিরিয়ে আনছিল।

বিশেষ করে paracrocodylomorph-রা গবেষকদের কাছে গুরুত্বপূর্ণ। কারণ তাদের জীবাশ্মের নথি তুলনামূলকভাবে অল্প।

Shakajlura আবিষ্কারের আগে Chañares Formation থেকে মাত্র একটি paracrocodylomorph নমুনা—Luperosuchus fractus—পরিচিত ছিল।

এখন আছে দুটি।

দুটি শিকারি।

দুই সেট হাড়।

একটি হারিয়ে যাওয়া বাস্তুতন্ত্রের দুটি সূত্র।

আর তারা একসঙ্গে আমাদের মনে করিয়ে দেয়—

আধুনিক পৃথিবীতে পৌঁছানোর পথটি ডাইনোসরের পরিচিত গল্পের চেয়ে অনেক বেশি অদ্ভুত ছিল।

অনেক আগে, T. rex পৃথিবীতে হাঁটার আগে—

কুমির-বংশীয় প্রাণীরাই খাদ্যশৃঙ্খলের শীর্ষে শিকার করছিল।

আর আর্জেন্টিনার আগ্নেয় শিলার গভীর থেকে তাদের সেই বিস্মৃত দৈত্যদের একজন—

অবশেষে ফিরে এসেছে।


বৈজ্ঞানিক নোট

২০২৬ সালে Papers in Palaeontology, Volume 12, Issue 3-এ Ariel F. Cardillo, Julia B. Desojo, M. Belén von Baczko, Martín D. Ezcurra, Agustín G. Martinelli, Nahuel Vega এবং Lucas E. Fiorelli Shakajlura riojanensis-এর আনুষ্ঠানিক বৈজ্ঞানিক বিবরণ প্রকাশ করেন।

গবেষণায় প্রাণীটিকে একটি প্রাথমিক শাখার paracrocodylomorph হিসেবে শনাক্ত করা হয়েছে। তবে গবেষকেরা উল্লেখ করেছেন যে Loricata-র ভেতরে আরও প্রাথমিক শাখায় এর অবস্থান সম্পূর্ণভাবে বাতিল করা যায় না।

প্রাথমিক বৈজ্ঞানিক উৎস: Papers in Palaeontology — Cardillo et al. (2026).

Leave a Comment