
VOIB | অনুসন্ধানী কভার স্টোরি
মসজিদ থেকে মন্ত্রণালয়
বাংলাদেশের ধর্মীয় পরিসর কীভাবে বদলে দিচ্ছে অভ্যুত্থান-পরবর্তী সামাজিক চুক্তি
সাঈফুল ইসলাম | সেপ্টেম্বর ২০২৬
বাংলাদেশে রাজনীতি কখনো শুধু সংসদ ভবনের ভেতরে থাকে না।
চায়ের দোকানের বেঞ্চে তার আলোচনা হয়। বিশ্ববিদ্যালয়ের করিডরে তার ভাষা বদলে যায়। কারখানার ফটকে তার হিসাব মেলে। গ্রামের বাজারে তার ব্যাখ্যা তৈরি হয়। ফেসবুকের পর্দায় তার নতুন জীবন শুরু হয়।
আর শুক্রবার?
রাজনীতি কখনো কখনো উঠে আসে মসজিদের মিম্বারেও।
২০২৬ সালের বাংলাদেশে এই দৃশ্যটি আর উপেক্ষা করার মতো নয়।
কারণ ধর্মীয় কর্তৃত্বের পুরোনো ঠিকানা—মসজিদ, মাদ্রাসা, মাজার, ওয়াজ মাহফিল—এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে নতুন ঠিকানা: সংসদ, নির্বাচন, আদালত, সামাজিক সেবা, ইউটিউব, ফেসবুক এবং ডিজিটাল জনপরিসর।
প্রশ্নটি তাই শুধু ধর্মীয় নয়।
প্রশ্নটি রাষ্ট্রের।
কে বাংলাদেশের ভবিষ্যৎ নিয়ে কথা বলবে?
আর সেই কথার রাজনৈতিক সীমা কোথায়?
একটি আইন, একটি বিতর্ক—আর বড় হয়ে ওঠা প্রশ্ন
৬ সেপ্টেম্বর জাতীয় সংসদে Transfer of Property (Amendment) Bill, 2026 পাস হয়। সংশোধিত আইনে সম্পত্তি হস্তান্তরের পরও দাতার জীবদ্দশায় সেই সম্পত্তি ব্যবহার বা ভোগের অধিকার রাখার সুযোগ রাখা হয়েছে।
আইনের উদ্দেশ্য নিয়ে সরকারের ব্যাখ্যাও আছে। আইনমন্ত্রী মো. আসাদুজ্জামান বলেছেন, সংশোধনী নিয়ে বিভ্রান্তি ছড়ানো হচ্ছে এবং হেবা আইনের সঙ্গে সাংঘর্ষিক হওয়ার দাবি তিনি প্রত্যাখ্যান করেছেন।
অন্যদিকে জামায়াতে ইসলামীসহ কয়েকটি ধর্মীয়-রাজনৈতিক সংগঠন আপত্তি তুলেছে। তাদের বক্তব্য, নতুন ব্যবস্থাটি হিবা, ওসিয়ত ও উত্তরাধিকারসংক্রান্ত ইসলামী বিধানের সঙ্গে সাংঘর্ষিক হতে পারে।
এখানেই বিষয়টি একটি সম্পত্তি আইনের সীমা ছাড়িয়ে যায়।
কারণ প্রশ্নটি দাঁড়ায়—
রাষ্ট্রের আইন তৈরি হবে কোন ভিত্তিতে?
সংসদে নির্বাচিত প্রতিনিধিদের সিদ্ধান্তে?
আদালতের ব্যাখ্যায়?
ধর্মীয় বিশেষজ্ঞদের মতামতে?
নাকি এসবের সঙ্গে নাগরিকদের সাংবিধানিক অধিকার ও মতামতও সমানভাবে বিবেচনায় থাকবে?
বাংলাদেশের বর্তমান রাজনৈতিক বাস্তবতায় এই প্রশ্নের উত্তর এখন আর কেবল তাত্ত্বিক নয়।
আইনের একটি ধারা তাকে বাস্তব করে তুলেছে।
শাপলা চত্বর: যে রাত এখনো শেষ হয়নি
ইতিহাসের কিছু রাত ক্যালেন্ডার থেকে মুছে যায়।
কিন্তু রাজনীতি থেকে যায়।
২০১৩ সালের ৫ মে হেফাজতে ইসলামের সমাবেশ ঘিরে শাপলা চত্বরের ঘটনাও তেমন একটি অধ্যায়।
হেফাজতের কাছে এটি রাষ্ট্রের সঙ্গে সংঘাতের স্মৃতি।
রাষ্ট্রের বর্তমান আইনি প্রক্রিয়ায় এটি এখন মানবতাবিরোধী অপরাধের অভিযোগের বিষয়।
১৬ সেপ্টেম্বর আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল-২ ৭ অক্টোবর শেখ হাসিনাসহ ৪১ আসামির বিরুদ্ধে অভিযোগ গঠনের শুনানির তারিখ নির্ধারণ করেছে। প্রসিকিউশনের তথ্য অনুযায়ী, ৩০ জন আসামি পলাতক এবং ১১ জনকে ওই দিন ট্রাইব্যুনালে হাজির করা হয়। একই সঙ্গে প্রসিকিউশন ২০১৩ সালের ঘটনায় ৫৮ জনের মৃত্যুর কথা বলেছে।
তবে এখানে একটি বিষয় গুরুত্বপূর্ণ।
অভিযোগ আর প্রমাণিত অপরাধ এক বিষয় নয়।
আদালতের কাজ হলো অভিযোগ, সাক্ষ্য ও প্রমাণ পরীক্ষা করে আইনি সিদ্ধান্তে পৌঁছানো।
রাজনীতির কাজ স্মৃতি তৈরি করা।
বিচারের কাজ সেই স্মৃতিকে প্রমাণের মানদণ্ডে পরীক্ষা করা।
বাংলাদেশের সামনে এখন এই দুইয়ের পার্থক্য রক্ষা করার পরীক্ষাও রয়েছে।
‘মোল্লা’ বলতে আসলে কাদের বোঝায়?
একজন দাড়িওয়ালা আলেম?
একজন মাদ্রাসাশিক্ষক?
মসজিদের ইমাম?
একজন ওয়াজ বক্তা?
শব্দটি যত সহজ, বাস্তবতা তত জটিল।
আজকের ধর্মীয় পরিসরে রয়েছেন কওমি মাদ্রাসার আলেম, মসজিদভিত্তিক ইমাম, সুফি ধারার পীর ও অনুসারী, রাজনৈতিক দলের কর্মী, স্বাধীন ধর্মীয় বক্তা, অনলাইন শিক্ষক, দাতব্য প্রতিষ্ঠানের কর্মী এবং সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের কনটেন্ট নির্মাতা।
তাঁদের সবার লক্ষ্য এক নয়।
রাজনীতির ভাষাও এক নয়।
কেউ নির্বাচনমুখী।
কেউ সমাজসেবামুখী।
কেউ শিক্ষামুখী।
কেউ সরাসরি রাজনৈতিক ক্ষমতার প্রশ্নে সক্রিয়।
কেউ আবার কেবল ধর্মীয় শিক্ষা ও দাওয়াহ নিয়ে কাজ করেন।
তাই বাংলাদেশের ধর্মীয় পরিসরকে একটি একক ‘ব্লক’ হিসেবে দেখা বাস্তবতার অনেকটাই সরলীকরণ।
বরং এটি একটি বহুস্তরীয় নেটওয়ার্ক।
পুরোনো মিম্বর, নতুন প্রযুক্তি
একটি গ্রামের মাঠ।
সন্ধ্যার পর মাইকের শব্দ বাড়ছে।
মানুষ আসছে।
চায়ের দোকানে ভিড়।
কিশোরেরা মাঠের পাশে দাঁড়িয়ে।
বক্তা কোরআনের আয়াত দিয়ে শুরু করছেন।
তারপর আলোচনা চলে যাচ্ছে পরিবারে।
শিক্ষায়।
দুর্নীতিতে।
অর্থনীতিতে।
সমাজে।
রাজনীতিতে।
একসময় অনুষ্ঠান শেষ হয়।
কিন্তু বক্তৃতা শেষ হয় না।
কারণ কেউ সেটি ভিডিও করেছে।
পরদিন সেটি ইউটিউবে।
তারপর ফেসবুকে।
তারপর ছোট ভিডিও।
তারপর আরও ছোট ক্লিপ।
একটি গ্রামের মাহফিল তখন আর গ্রামের থাকে না।
গ্রামের মাঠটি হয়ে যায় ডিজিটাল স্টুডিও।
এখানেই বাংলাদেশের ধর্মীয় জনপরিসরে বড় পরিবর্তনটি ঘটেছে।
আগে বক্তাকে মানুষের কাছে যেতে হতো।
এখন বক্তৃতা মানুষের ফোনে পৌঁছে যায়।
একটি মিম্বরের শ্রোতা কয়েক হাজার হতে পারে।
একটি ভিডিওর দর্শক হতে পারে তার বহুগুণ।
এই পরিবর্তন শুধু ধর্মীয় যোগাযোগের পদ্ধতি বদলায়নি।
বদলে দিয়েছে প্রভাব তৈরির অর্থনীতিও।
সেবার মধ্য দিয়ে প্রভাব
রাজনীতির দৃশ্যমান অংশের বাইরে আরও একটি নীরব প্রতিযোগিতা চলছে।
কে মানুষের পাশে দাঁড়াবে?
বন্যার পর কে খাবার দেবে?
দরিদ্র পরিবারের জন্য কে সহায়তা করবে?
কারিগরি প্রশিক্ষণ কে দেবে?
চিকিৎসার খরচ কে বহন করবে?
এই জায়গায় ধর্মভিত্তিক কল্যাণমূলক সংগঠনগুলোর ভূমিকা গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠছে।
আস-সুন্নাহ ফাউন্ডেশনের মতো প্রতিষ্ঠান ধর্মীয় বার্তার পাশাপাশি ত্রাণ, দাতব্য কার্যক্রম, দক্ষতা উন্নয়ন ও ডিজিটাল যোগাযোগের মাধ্যমে মানুষের সঙ্গে সম্পর্ক তৈরি করছে।
এখানে একটি গুরুত্বপূর্ণ পরিবর্তন ঘটে।
একজন মানুষ যখন কোনো ধর্মীয় প্রতিষ্ঠানের কাছ থেকে ত্রাণ পান, প্রশিক্ষণ পান কিংবা জীবিকার উপকরণ পান, তখন তার সঙ্গে প্রতিষ্ঠানের সম্পর্ক শুধু ধর্মীয় বক্তব্য শোনার মধ্যে থাকে না।
সম্পর্কটি হয়ে ওঠে বাস্তব।
ধর্মীয় পরিচয় তখন সামাজিক সেবার সঙ্গে যুক্ত হয়।
কেউ একে খিদমত বলবেন।
কেউ বলবেন সামাজিক পুঁজি।
কেউ বলবেন জনসম্পৃক্ততা।
শব্দ আলাদা।
ঘটনাটি একই।
ভোটের মাঠেও বদল
ধর্মীয় রাজনীতি এখন শুধু মসজিদের উঠান বা ওয়াজ মাহফিলের বিষয় নয়।
এটি নির্বাচনী কাঠামো নিয়েও কথা বলছে।
ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশ আনুপাতিক প্রতিনিধিত্ব বা PR পদ্ধতির পক্ষে অবস্থান নিয়েছে এবং জুলাই সনদের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট রাজনৈতিক সংস্কারের প্রশ্ন তুলেছে।
এ ধরনের দাবি শুধু ধর্মীয় পরিচয়ের ভাষায় সীমাবদ্ধ নয়।
এখানে ব্যবহৃত হচ্ছে—
সংবিধান।
নির্বাচনী ব্যবস্থা।
প্রতিনিধিত্ব।
সংসদ।
রাজনৈতিক সংস্কার।
অর্থাৎ ধর্মীয় রাজনৈতিক শক্তিগুলো রাষ্ট্রের আধুনিক প্রাতিষ্ঠানিক ভাষা ব্যবহার করছে।
এটি গুরুত্বপূর্ণ পরিবর্তন।
কারণ একসময়ের ‘ধর্মীয় রাজনীতি’ যেখানে মূলত নৈতিকতা ও ধর্মীয় পরিচয়ের ভাষায় কথা বলত, সেখানে এখন নির্বাচনী ব্যবস্থার নকশা নিয়েও কথা বলছে।
একটি ‘ইসলামপন্থী ব্লক’—নাকি অনেকগুলো পরিসর?
বাংলাদেশের ধর্মীয় রাজনীতিকে বুঝতে হলে এখানেই থামতে হবে।
কারণ ‘ইসলামপন্থী ব্লক’ বলে একটি একক রাজনৈতিক বাস্তবতা ধরে নেওয়া বিভ্রান্তিকর হতে পারে।
কওমি পরিসর ও জামায়াতে ইসলামী একই রাজনৈতিক ঐতিহ্যের অংশ নয়।
সুফিভিত্তিক রাজনৈতিক সংগঠনগুলোর নিজস্ব সাংগঠনিক সংস্কৃতি রয়েছে।
ইসলামী আন্দোলনের নিজস্ব নির্বাচনী কৌশল রয়েছে।
ডিজিটাল বক্তাদের অনেকেই কোনো দলীয় কাঠামোর বাইরে কাজ করেন।
কল্যাণমূলক প্রতিষ্ঠান আবার সংসদীয় রাজনীতিতে না গিয়েও সামাজিক প্রভাব তৈরি করতে পারে।
ফলে ছবিটি একটি পিরামিডের মতো নয়।
বরং—
একটি জটিল ইকোসিস্টেম।
এখানে সহযোগিতা আছে।
প্রতিযোগিতা আছে।
মতপার্থক্য আছে।
কখনো সংঘাতও আছে।
আর এই বহুত্বই ধর্মীয় প্রভাবের প্রকৃত চরিত্র বোঝার জন্য গুরুত্বপূর্ণ।
নারী: এই পরিবর্তনের দর্শক নন
বাংলাদেশের ধর্মীয় পরিবর্তনের আলোচনা করতে গেলে নারীদের কথা আলাদা করে বলতে হয়।
কারণ নারীরা শুধু এই পরিবর্তনের প্রভাব গ্রহণ করছেন না।
তাঁরা নিজেরাও সিদ্ধান্ত নিচ্ছেন।
কেউ হিজাব পরছেন ধর্মীয় বিশ্বাস থেকে।
কেউ সামাজিক পরিবেশের সঙ্গে সমন্বয় করতে।
কেউ ব্যক্তিগত পছন্দে।
আবার কেউ হয়তো হিজাব বা নিকাবের সঙ্গে রাজনীতির কোনো সম্পর্কই দেখেন না।
একই সঙ্গে বাংলাদেশে নারীরা কারখানায় কাজ করছেন, বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ছেন, পেশাজীবনে প্রবেশ করছেন, ব্যবসা করছেন।
এই দুই বাস্তবতা পাশাপাশি চলছে।
এখানে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্নটি হওয়া উচিত—
নারীর নিজের সিদ্ধান্তের জায়গাটি কোথায়?
রাষ্ট্র যদি তার হয়ে সিদ্ধান্ত নিতে চায়?
ধর্মীয় প্রতিষ্ঠান যদি তার হয়ে সিদ্ধান্ত নিতে চায়?
পরিবার যদি তার হয়ে সিদ্ধান্ত নিতে চায়?
প্রতিটি ক্ষেত্রেই নাগরিক স্বাধীনতার প্রশ্ন সামনে আসে।
গ্রামের সালিস: রাষ্ট্রের বাইরে আরেক রাষ্ট্র?
ঢাকার বাইরে গেলে বাংলাদেশের বিচারব্যবস্থার আরেকটি বাস্তবতা চোখে পড়ে।
সালিস।
জমি নিয়ে বিরোধ।
পারিবারিক বিবাদ।
বিয়ে নিয়ে সমস্যা।
প্রতিবেশীর সঙ্গে ঝামেলা।
আনুষ্ঠানিক আদালতে যেতে সময় লাগে।
খরচ হয়।
কখনো বহু বছরও কেটে যায়।
কিন্তু গ্রামের একজন ইমাম, শিক্ষক, মাতব্বর বা স্থানীয় গণ্যমান্য ব্যক্তি হয়তো কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই দুই পক্ষকে বসাতে পারেন।
এ কারণেই অনানুষ্ঠানিক সালিস টিকে আছে।
এটি সব সময় রাষ্ট্রকে প্রত্যাখ্যান করার ফল নয়।
অনেক সময় এটি রাষ্ট্রের ধীরগতির প্রতিক্রিয়া।
কিন্তু এখানেই সীমারেখার প্রশ্ন আসে।
সালিস যদি সাংবিধানিক অধিকার লঙ্ঘন করে?
দ্রুত নিষ্পত্তি কি ন্যায়বিচারের বিকল্প হতে পারে?
সামাজিক আস্থা কি আইনি প্রক্রিয়ার বিকল্প?
রাষ্ট্রের সামনে চ্যালেঞ্জ হলো—মানুষের বাস্তব সামাজিক প্রতিষ্ঠানগুলোকে বোঝা, কিন্তু ব্যক্তির অধিকার সুরক্ষার দায়িত্বও অক্ষুণ্ন রাখা।
বাংলাদেশের আসল বৈপরীত্য কোথায়?
বাংলাদেশকে একসময় উন্নয়নের গল্প দিয়ে বোঝানো হতো।
পোশাকশিল্প।
ক্ষুদ্রঋণ।
নারীশিক্ষা।
মোবাইল ব্যাংকিং।
অভিবাসী শ্রম।
ডিজিটাল অর্থনীতি।
কিন্তু একই বাংলাদেশে ধর্মীয় জনপরিসরও ক্রমে দৃশ্যমান।
এ দুটি বিষয় পরস্পরবিরোধী—এমন ধারণা হয়তো খুব সরল।
একজন মানুষ স্মার্টফোন ব্যবহার করতে পারেন এবং ধর্মীয় মাহফিলেও যেতে পারেন।
একজন নারী বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়তে পারেন এবং হিজাবও পরতে পারেন।
একজন সফটওয়্যার প্রকৌশলী টিকটকে ধর্মীয় বক্তার বক্তব্য শুনতে পারেন।
একজন ব্যবসায়ী আধুনিক আর্থিক ব্যবস্থায় কাজ করতে পারেন এবং জাকাত দিতে পারেন।
অর্থাৎ বাংলাদেশ ঐতিহ্য থেকে আধুনিকতার দিকে একমুখী পথে হাঁটছে না।
বাংলাদেশ একই সঙ্গে একাধিক সময়ের মধ্যে বসবাস করছে।
এটাই হয়তো তার সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বৈশিষ্ট্য।
মিনার থেকে অ্যালগরিদম
আগের ধর্মীয় প্রভাবের একটি নির্দিষ্ট ঠিকানা ছিল।
মসজিদ।
মাদ্রাসা।
মাজার।
হাট।
এখন সেই মানচিত্রের সঙ্গে যুক্ত হয়েছে—
ইউটিউব।
ফেসবুক।
টিকটক।
হোয়াটসঅ্যাপ।
লাইভস্ট্রিম।
অনলাইন প্রশ্নোত্তর।
একজন বক্তা এখন আর শুধু বক্তা নন।
তিনি একই সঙ্গে কনটেন্ট নির্মাতা।
সম্পাদক।
সম্প্রচারক।
কমিউনিটি লিডার।
কখনো রাজনৈতিক মতামত নির্মাতা।
আর অ্যালগরিদম ঠিক করে দিতে পারে কোন বক্তব্য কত মানুষের কাছে পৌঁছাবে।
এখানেই রাষ্ট্রের পুরোনো নিয়ন্ত্রণব্যবস্থা নতুন সমস্যার মুখে পড়ে।
রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠান নিয়ন্ত্রণ করতে পারে।
কিন্তু প্রভাবের প্রবাহ নিয়ন্ত্রণ করা অনেক কঠিন।
অভ্যুত্থানের পর আসল প্রশ্ন
একটি রাজনৈতিক ব্যবস্থা ভেঙে পড়ার পর সবচেয়ে কঠিন কাজ শুরু হয়।
নতুন ব্যবস্থা তৈরি করা।
বাংলাদেশ এখন সেই পর্যায়ে।
এখানে একসঙ্গে কথা বলবে—
ধর্মীয় বাংলাদেশ।
ধর্মনিরপেক্ষ বাংলাদেশ।
জাতীয়তাবাদী বাংলাদেশ।
উদার বাংলাদেশ।
রক্ষণশীল বাংলাদেশ।
শহরের বাংলাদেশ।
গ্রামের বাংলাদেশ।
তরুণ বাংলাদেশ।
বয়স্ক বাংলাদেশ।
সংখ্যাগুরু ও সংখ্যালঘু—সব নাগরিক।
এই বাস্তবতার মধ্যে ধর্মীয় প্রতিষ্ঠানগুলোও থাকবে।
তাদের বাদ দিয়ে নতুন সামাজিক চুক্তি তৈরি করা সম্ভব নয়।
কিন্তু একই সঙ্গে কোনো ধর্মীয় প্রতিষ্ঠানকেও রাষ্ট্রের ওপর সাংবিধানিক কর্তৃত্ব দেওয়া যায় না।
এই দুই বাস্তবতার মাঝখানেই বাংলাদেশের নতুন রাজনৈতিক ভারসাম্য খুঁজে নিতে হবে।
শেষ কথা: মাইক্রোফোন কি ম্যান্ডেট?
২০২৬ সালের বাংলাদেশের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ছবি হয়তো সংসদের কোনো বিতর্ক নয়।
হয়তো সেটি একটি গ্রামের মাঠ।
একজন বক্তা মাইক্রোফোন হাতে দাঁড়িয়ে আছেন।
হাজার মানুষ শুনছে।
কেউ ভিডিও করছে।
কেউ লাইভ দিচ্ছে।
একই সময়ে ঢাকায় সংসদে একটি আইন নিয়ে বিতর্ক চলছে।
আদালতে পুরোনো একটি ঘটনার বিচারিক প্রক্রিয়া এগোচ্ছে।
কোনো স্বেচ্ছাসেবক বন্যার্ত মানুষের হাতে খাবার তুলে দিচ্ছেন।
একজন তরুণী বিশ্ববিদ্যালয়ের দিকে হাঁটছেন।
একজন কারখানাশ্রমিক মোবাইলে একটি ধর্মীয় বক্তব্য শুনছেন।
দৃশ্যগুলো আলাদা।
কিন্তু এগুলো একই বাংলাদেশের ছবি।
আর সবকিছুর কেন্দ্রে একটি প্রশ্ন:
বাংলাদেশকে সংজ্ঞায়িত করবে কে?
শুধু রাজনীতিবিদেরা নয়।
শুধু আলেমরাও নয়।
শুধু বিচারকেরাও নয়।
শুধু কর্মীরাও নয়।
এমনকি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের অ্যালগরিদমও নয়।
গণতন্ত্রের মূল প্রশ্নটি আরও সরল:
রাষ্ট্রের বৈধতার শেষ উৎস নাগরিক।
ধর্মীয় প্রতিষ্ঠান জনজীবনে প্রভাব ফেলতে পারে।
ধর্মীয় নাগরিকেরা রাজনৈতিকভাবে সক্রিয় হতে পারেন।
ধর্মীয় সংগঠন সামাজিক সেবা দিতে পারে।
ধর্মীয় দল নির্বাচন করতে পারে।
কিন্তু প্রভাব আর সার্বভৌমত্ব এক নয়।
বিশ্বাস আর আইন এক নয়।
জনপ্রিয়তা আর সাংবিধানিক কর্তৃত্ব এক নয়।
আর—
একটি মাইক্রোফোন কোনো ম্যান্ডেট নয়।
বাংলাদেশের সামনে এখন যে কাজটি, তা কোনো একটি নির্বাচন বা কোনো একটি সংসদ কিংবা কোনো একজন ধর্মীয় নেতার মাধ্যমে শেষ হবে না।
এটি চলবে গ্রামে।
বিশ্ববিদ্যালয়ে।
কারখানায়।
মসজিদে।
আদালতে।
সংসদে।
এবং মানুষের মোবাইলের পর্দায়।
পুরোনো রাজনৈতিক ব্যবস্থা পেছনে পড়ে গেছে।
এখন তৈরি হচ্ছে নতুন সামাজিক চুক্তি।
তার চূড়ান্ত রূপ এখনো স্পষ্ট নয়।
তবে একটি বিষয় স্পষ্ট হয়ে উঠছে—
বাংলাদেশের ভবিষ্যৎ নিয়ে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ কথোপকথনটি হয়তো মসজিদ থেকে মন্ত্রণালয় পর্যন্ত বিস্তৃত সেই দীর্ঘ পথেই চলছে।