
VOIB | আন্তর্জাতিক প্রচ্ছদ প্রতিবেদন
ঝড়ের মধ্যেও স্থির থাকার সাহস
ভয়, বিশ্বাস, নেতৃত্ব ও মানুষের অদ্ভুত মানসিক শক্তি—নবী করিম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের জীবন থেকে পাঁচটি শিক্ষা
চৌদ্দশ বছর আগে আরবের মরুভূমিতে একদল মানুষ রওনা হয়েছিল। পেছনে ছিল শত্রু, সামনে অনিশ্চিত ভবিষ্যৎ। হাতে ছিল সীমিত সামর্থ্য, কিন্তু হৃদয়ে ছিল এমন এক বিশ্বাস—যা ভয়ের চেয়েও বড়। সেই হিজরতের গল্প আজও আমাদের শেখায়, বিপদের সময় কীভাবে স্থির থাকতে হয়, কীভাবে বিশ্বাস কর্মের শক্তি হয়ে ওঠে এবং কীভাবে একটি ছোট্ট দল একদিন একটি সমাজ গড়ে তুলতে পারে।
মরুভূমি তখন নীরব ছিল
মরুভূমি সাধারণত নীরব।
কিন্তু সেই রাতের নীরবতা ছিল অন্যরকম।
দূরে কোথাও ঘোড়ার শব্দ হতে পারে।
কেউ হয়তো অনুসরণ করছে।
মক্কা ছেড়ে বেরিয়ে এসেছেন মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম। সঙ্গে হযরত আবু বকর রাদিয়াল্লাহু তা’আলা আনহু।
পেছনে রয়েছে শত্রু।
তাঁদের ধরিয়ে দিতে পুরস্কার ঘোষণা করা হয়েছে।
একটু ভুল হলেই সব শেষ।
এমন সময় একজন মানুষ ঘোড়ায় চড়ে তাঁদের পিছু নিলেন।
তিনি সুরাকা ইবন মালিক।
সুরাকা ধীরে ধীরে কাছে আসছেন।
আরও কাছে।
এত কাছে যে, তিনি নবী করিম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের কণ্ঠে কুরআন তিলাওয়াত শুনতে পাচ্ছেন।
দৃশ্যটি কল্পনা করলে অদ্ভুত লাগে।
একজন মানুষ পালিয়ে যাচ্ছেন।
একজন মানুষ তাঁকে ধরতে ছুটে আসছেন।
আর সেই মুহূর্তে পালিয়ে যাওয়া মানুষটি পেছনে তাকিয়ে আতঙ্কিত হচ্ছেন না।
তিনি কুরআন তিলাওয়াত করছেন।
হযরত আবু বকর রাদিয়াল্লাহু তা’আলা আনহু উদ্বিগ্ন হয়ে চারদিকে তাকাচ্ছেন।
কিন্তু নবী করিম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম?
তিনি স্থির।
সাহিহ আল-বুখারির বর্ণনায় সুরাকা এই ঘটনাটির কথা স্মরণ করেছেন। তিনি নবীজির কুরআন তিলাওয়াত শুনেছিলেন এবং দেখেছিলেন, তিনি বারবার পেছনে তাকাচ্ছিলেন না।
এই দৃশ্যের মধ্যে যেন একটি ছোট্ট বাক্য লুকিয়ে আছে—
ভয় থাকতে পারে। কিন্তু ভয়কে সিদ্ধান্ত নিতে দিতে হয় না।
«মনে রাখার মতো কথা
“ভয় চলে যাওয়ার অপেক্ষা করো না। ভয়ের মধ্যেই সঠিক কাজটি করে যাও।”»
এক. বিপদ মানেই ভেঙে পড়া নয়
আমাদের জীবনেও মরুভূমি আছে।
অবশ্য সেই মরুভূমিতে বালি থাকে না।
কখনো সেখানে থাকে হাসপাতালের করিডোর।
কখনো চাকরি হারানোর খবর।
কখনো ব্যাংকের হিসাবের লাল সংখ্যা।
কখনো সম্পর্ক ভেঙে যাওয়ার নিঃশব্দ রাত।
কখনো ভবিষ্যৎ নিয়ে এমন অনিশ্চয়তা আসে যে মনে হয়—আগামীকাল বলে কিছু নেই।
চৌদ্দশ বছর আগে মানুষের হাতে মুঠোফোন ছিল না।
কিন্তু মানুষের ভয় ছিল।
আজও আছে।
শুধু ভয়ের ধরন বদলেছে।
আগে শত্রু ঘোড়ায় চড়ে আসত।
এখন অনেক সময় শত্রু আসে একটি ফোনের পর্দায়।
একটি খবর।
একটি ই-মেইল।
একটি রিপোর্ট।
একটি বাক্য।
তারপর মানুষের বুকের ভেতর ছোট্ট একটা ঝড় শুরু হয়।
হিজরতের সেই রাত আমাদের একটি অন্যরকম মানসিকতার কথা মনে করিয়ে দেয়।
কুরআনে সেই সংকটের কথা বলতে গিয়ে এসেছে:
“দুঃখ করো না, নিশ্চয়ই আল্লাহ আমাদের সঙ্গে আছেন।”
এই বাক্যের মধ্যে সাকিনা—প্রশান্তির একটি ধারণা—আছে।
অর্থাৎ, চারপাশের বিপদ অস্বীকার করা নয়।
বরং বিপদের মধ্যেও অন্তরের ভারসাম্য ধরে রাখা।
আধুনিক মনোবিজ্ঞানের গবেষণাতেও ধর্মীয় বিশ্বাস ও মানসিক মোকাবিলার সম্পর্ক নিয়ে আলোচনা হয়েছে। তবে সব ধরনের ধর্মীয় মোকাবিলা সমান নয়; ইতিবাচক ধর্মীয় মোকাবিলা ও নেতিবাচক ধর্মীয় মোকাবিলার ফল আলাদা হতে পারে।
এখানেই বিষয়টি গুরুত্বপূর্ণ।
বিশ্বাস মানে এই নয়—
“আমার কোনো বিপদ হবে না।”
বরং বিশ্বাস বলতে বোঝাতে পারে—
“বিপদ এলেও আমি জানি, আমাকে কী করতে হবে।”
এই দুটির মধ্যে পার্থক্য অনেক।
দুই. বর্তমান যত অন্ধকারই হোক, ভবিষ্যৎ তার চেয়ে বড় হতে পারে
সুরাকার গল্পে আরেকটি ঘটনা ইসলামী ইতিহাসে বিশেষভাবে আলোচিত।
বলা হয়, নবী করিম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম সুরাকাকে বলেছিলেন—
“সুরাকা, কিসরার কঙ্কণ তোমার হাতে পরানো হলে তোমার অবস্থা কেমন হবে?”
একটু ভাবুন।
যিনি তখন নিরাপত্তার জন্য মরুভূমির পথে চলছেন, তাঁর মাথার ওপর শত্রুর পুরস্কার ঘোষণা করা হয়েছে।
তিনি তখন পারস্য সাম্রাজ্যের ভবিষ্যৎ নিয়ে কথা বলছেন।
কিসরা তখন পৃথিবীর অন্যতম শক্তিশালী সাম্রাজ্যের প্রতীক।
পরে ইসলামী ঐতিহ্যে বর্ণিত হয়েছে, হযরত ওমর রাদিয়াল্লাহু তা’আলা আনহুর সময় সুরাকার হাতে সেই কঙ্কণ পরানো হয়।
তবে এখানে একটি কথা পরিষ্কার করে বলা দরকার।
সুরাকার অনুসরণের ঘটনা সাহিহ আল-বুখারিতে স্পষ্টভাবে বর্ণিত। কিন্তু কিসরার কঙ্কণের নির্দিষ্ট ঘটনাটি পরবর্তী ঐতিহাসিক ও জীবনীগ্রন্থে এসেছে এবং এর সনদ নিয়ে মুহাদ্দিসদের মধ্যে আলোচনা রয়েছে।
সুতরাং একজন দায়িত্বশীল লেখকের কাজ হলো—বিশ্বাসের আবেগকে সম্মান করা, আবার সূত্রের পার্থক্যও গোপন না করা।
তবু গল্পটির একটি গভীর মানবিক অর্থ আছে।
মানুষ যখন কেবল বর্তমানের দিকে তাকায়, তখন সে ভয় পায়।
আর যখন সে একটি অর্থপূর্ণ ভবিষ্যৎ দেখতে পায়, তখন সে হাঁটতে পারে।
একটি সমাজও তাই।
শুধু কষ্টের গল্প দিয়ে কোনো সমাজ দীর্ঘদিন টিকে থাকতে পারে না।
তার একটি স্বপ্ন দরকার।
একটি ভবিষ্যৎ দরকার।
একটি বিশ্বাস দরকার—
আজকের অবস্থা শেষ কথা নয়।
তিন. তাওয়াক্কুল মানে বসে থাকা নয়
আল্লাহর ওপর ভরসা করা—তাওয়াক্কুল।
শব্দটি খুব সুন্দর।
কিন্তু অনেক সময় আমরা এর অর্থ ভুল বুঝি।
কেউ হয়তো বলল—
“আল্লাহর ওপর ভরসা করছি।”
তারপর আর কোনো প্রস্তুতি নেই।
কোনো পরিকল্পনা নেই।
কোনো চেষ্টা নেই।
শুধু অপেক্ষা।
নবী করিম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের জীবন তাওয়াক্কুলের এমন শিক্ষা দেয় না।
হিজরতের পরিকল্পনা ছিল।
সঙ্গী নির্বাচন ছিল।
যাত্রার ব্যবস্থা ছিল।
পথের ব্যাপারে সতর্কতা ছিল।
অর্থাৎ—
বিশ্বাস ছিল, কিন্তু পরিকল্পনাও ছিল।
এটি খুব সাধারণ একটি কথা।
তবু আমরা জীবনে এটি ভুলে যাই।
পরীক্ষার আগে পড়তে হবে।
চাকরির আগে প্রস্তুতি নিতে হবে।
অসুস্থ হলে চিকিৎসকের কাছে যেতে হবে।
বিপদের সময় নিরাপত্তা নিতে হবে।
পরিবারের ভবিষ্যতের জন্য পরিকল্পনা করতে হবে।
তারপর?
তারপর ফলাফল আল্লাহর হাতে।
এটাই তাওয়াক্কুলের সৌন্দর্য।
মানুষ সবকিছু নিয়ন্ত্রণ করতে পারে না
মানুষের একটি অদ্ভুত অভ্যাস আছে।
সে এমন সব বিষয় নিয়েও চিন্তা করে, যার ওপর তার কোনো নিয়ন্ত্রণ নেই।
আমি কী করব—এটি আমার হাতে।
কিন্তু অন্য মানুষ কী করবে—সবসময় আমার হাতে নয়।
আমি চেষ্টা করতে পারি।
কিন্তু ফলাফল সবসময় আমার হাতে নয়।
এই সীমারেখাটি বুঝতে পারা মানসিক শান্তির জন্য খুব গুরুত্বপূর্ণ।
চেষ্টা আমার দায়িত্ব।
ফলাফল আমার মালিকানা নয়।
এই একটি ধারণা অনেক উদ্বেগকে ছোট করে দিতে পারে।
চার. মাথার ওপর তরবারি—আর একটি শব্দ
আরেকটি ঘটনা।
মরুভূমি।
একটি গাছের নিচে বিশ্রাম নিচ্ছেন নবী করিম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম।
তাঁর তরবারি ঝুলছে।
এক ব্যক্তি এসে তরবারিটি হাতে তুলে নিল।
তারপর প্রশ্ন করল—
“এখন তোমাকে আমার হাত থেকে কে বাঁচাবে?”
মানুষ হলে হয়তো গলা শুকিয়ে যেত।
কথা বের হতো না।
হৃদস্পন্দন বেড়ে যেত।
কিন্তু নবী করিম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন—
“আল্লাহ।”
শুধু একটি শব্দ।
আল্লাহ।
সাহিহ আল-বুখারিতে ঘটনাটি বর্ণিত হয়েছে। পরে সেই ব্যক্তি তরবারি হারায় এবং নবী করিম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাকে শাস্তি দেননি।
এই গল্পের সবচেয়ে সুন্দর অংশটি হয়তো তরবারি নয়।
ক্ষমা।
বিপদ কেটে যাওয়ার পর প্রতিশোধ নেওয়ার সুযোগ ছিল।
কিন্তু তিনি প্রতিশোধ নিলেন না।
এখানে শক্তির আরেকটি সংজ্ঞা পাওয়া যায়।
শক্তি শুধু শত্রুকে পরাজিত করা নয়।
শক্তি হলো—
শত্রুকে পরাজিত করার পরও নিজের চরিত্রকে পরাজিত হতে না দেওয়া।
«মনে রাখার মতো কথা
“সত্যিকারের শক্তি হলো—বিপদ তোমার আচরণ ঠিক করবে না।”»
পাঁচ. সংকটের সময়ও নীতির দাম থাকে
বদরের ময়দান।
মুসলিমরা সংখ্যায় কম।
সম্পদ সীমিত।
পরিস্থিতি কঠিন।
এমন সময় একজন শক্তিশালী যোদ্ধা এসে যুদ্ধের সঙ্গে যোগ দেওয়ার আগ্রহ প্রকাশ করেন।
শুনতে ভালোই লাগছে।
একজন দক্ষ যোদ্ধা তো দরকার।
কিন্তু তাঁর উদ্দেশ্য ছিল গনিমতের সম্পদ লাভ করা।
নবী করিম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাঁর ঈমান সম্পর্কে জানতে চাইলেন।
প্রথমে তাঁকে ফিরে যেতে বলা হয়।
পরে তিনি ঈমান গ্রহণ করে ফিরে এলে তাঁকে গ্রহণ করা হয়।
ঘটনাটি সাহিহ মুসলিমে বর্ণিত হয়েছে।
এখানে যুদ্ধের কৌশলের চেয়ে অন্য একটি বিষয় বড় হয়ে ওঠে।
নীতি।
সংকটের সময় নীতি মেনে চলা সহজ নয়।
তখন মনে হয়—
“এখন একটু আপস করলে কী এমন হবে?”
“এই মানুষটিকে নিলেই তো শক্তি বাড়বে।”
“পরিস্থিতি ভালো হলে পরে নীতি নিয়ে ভাবা যাবে।”
কিন্তু একটি প্রতিষ্ঠানের চরিত্র তৈরি হয় এমন মুহূর্তেই।
যখন নীতি পালন করা সুবিধাজনক নয়।
যখন নীতির জন্য কিছু হারাতে হয়।
সেখানেই বোঝা যায়—
কোন মূল্যবোধ সত্যিই মূল্যবান।
পাশের কথা | পাঁচটি শিক্ষা
১ | শান্ত থাকুন
বিপদ সত্যি হতে পারে। কিন্তু আতঙ্ককে সিদ্ধান্তের মালিক হতে দেবেন না।
২ | বর্তমানের বাইরে তাকান
আজকের অন্ধকার ভবিষ্যতের শেষ কথা নয়।
৩ | চেষ্টা করুন, তারপর ভরসা রাখুন
তাওয়াক্কুল অলসতা নয়। এটি দায়িত্বশীল প্রচেষ্টার পর আল্লাহর ওপর নির্ভরতা।
৪ | নিজের পরিচয় ভুলবেন না
গভীর নৈতিক পরিচয় মানুষকে ভয়ের স্রোতে ভেসে যেতে বাধা দিতে পারে।
৫ | নীতিকে সস্তা করবেন না
যে মূল্যবোধ শুধু সুবিধার সময় থাকে, সেটি আসলে মূল্যবোধ নয়।
সাকিনার সমাজবিজ্ঞান
এখানেই গল্পটি ব্যক্তিগত জীবন থেকে বের হয়ে সমাজের দিকে চলে যায়।
হিজরত শুধু একজন মানুষের বেঁচে যাওয়ার গল্প নয়।
এটি একটি সমাজের গল্প।
একটি ছোট দল বিপদের মধ্য দিয়ে গেল।
তারপর তারা নতুন জায়গায় গিয়ে একটি সমাজ নির্মাণ করল।
এখানে সমাজবিজ্ঞানের একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় আছে—
মানুষ একা যতটা দুর্বল, একসঙ্গে ততটা নয়।
একজনের কাছে খাবার থাকতে পারে।
অন্যজনের কাছে আশ্রয়।
কেউ তথ্য দিতে পারে।
কেউ নিরাপত্তা দিতে পারে।
কেউ শিক্ষা দিতে পারে।
কেউ শুধু পাশে দাঁড়াতে পারে।
এইভাবেই ব্যক্তিগত শক্তি একসময় সামাজিক শক্তিতে পরিণত হয়।
ধর্মীয় সম্প্রদায়ের সামাজিক সহায়তা ও মানুষের মানসিক মোকাবিলার সম্পর্ক নিয়েও গবেষণা হয়েছে; তবে এর ফল পরিবেশ, ব্যক্তি ও ধর্মীয় অনুশীলনের ধরন অনুযায়ী পরিবর্তিত হয়।
অর্থাৎ, বিশ্বাস শুধু মাথার ভেতরের একটি ধারণা নয়।
সঠিকভাবে জীবিত হলে তা সম্পর্ক তৈরি করতে পারে।
দায়িত্ব তৈরি করতে পারে।
সহমর্মিতা তৈরি করতে পারে।
একটি মানুষকে বলতে শেখাতে পারে—
“আমি একা নই।”
আর একটি সমাজকে বলতে শেখাতে পারে—
“তুমিও একা নও।”
গুহা থেকে একটি সমাজ
হিজরতকে শুধু “পালিয়ে যাওয়া” বললে গল্পটি অসম্পূর্ণ থেকে যায়।
কারণ মানুষ শুধু পালায়নি।
মানুষ গড়েছিল।
মদিনা শুধু আশ্রয়ের স্থান হয়ে থাকেনি।
সেখানে একটি নতুন সামাজিক বাস্তবতা তৈরি হয়েছিল।
মুহাজির ও আনসারের সম্পর্ক গড়ে উঠেছিল।
সহযোগিতা তৈরি হয়েছিল।
প্রতিষ্ঠান তৈরি হয়েছিল।
সামাজিক দায়িত্ব তৈরি হয়েছিল।
অর্থাৎ—
বেঁচে থাকা থেকে নির্মাণে যাওয়া।
এটি সব বড় সামাজিক পরিবর্তনের একটি গুরুত্বপূর্ণ ধাপ।
একটি আন্দোলন শুধু প্রতিবাদ করে বাঁচতে পারে না।
একসময় তাকে কিছু নির্মাণ করতে হয়।
বিদ্যালয়।
প্রতিষ্ঠান।
পরিবার।
অর্থনৈতিক সহযোগিতা।
সামাজিক আস্থা।
নৈতিক কাঠামো।
নেতৃত্ব।
এই কারণেই হিজরতের গল্পের একটি গভীর বাক্য হতে পারে—
তারা শুধু বিপদ থেকে বেরিয়ে আসেনি। তারা বেরিয়ে এসে একটি ভবিষ্যৎ তৈরি করেছিল।
২০২৬-এর পৃথিবীতে এই গল্প কেন এত কাছের?
আমাদের মরুভূমি এখন বালির নয়।
আমাদের মরুভূমি হলো তথ্য।
সকালবেলা ঘুম থেকে উঠেই পৃথিবীর সব দুঃসংবাদ আমাদের হাতে চলে আসে।
যুদ্ধ।
অর্থনীতি।
রাজনীতি।
বেকারত্ব।
প্রযুক্তির পরিবর্তন।
সামাজিক বিভাজন।
জলবায়ু উদ্বেগ।
মানুষ সব জানে।
কিন্তু সবকিছু নিয়ন্ত্রণ করতে পারে না।
এখানেই আধুনিক মানুষের একটি অদ্ভুত সমস্যা।
আমরা পৃথিবীর সব খবর জানতে পারি, কিন্তু পৃথিবীর সব সমস্যা সমাধান করতে পারি না।
তাই হয়তো নবী করিম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের জীবন থেকে সবচেয়ে দরকারি শিক্ষা হতে পারে—
সবকিছু নিজের কাঁধে তুলে নিও না।
যেটুকু তোমার দায়িত্ব, সেটুকু করো।
তারপর আল্লাহর ওপর ভরসা রাখো।
পরিবারের জন্য যা করা দরকার—করো।
কাজের জন্য প্রস্তুত হও।
অসুস্থ হলে চিকিৎসা নাও।
কাউকে সাহায্য করার সুযোগ পেলে করো।
সত্য কথা বলো।
অন্যায়ের সামনে নীতিকে বিক্রি করো না।
আর যেটুকু তোমার নিয়ন্ত্রণের বাইরে—
সেটুকু আল্লাহর হাতে ছেড়ে দাও।
বিজয়ের অর্থ কী?
আমরা সাধারণত বিজয়কে খুব সহজভাবে দেখি।
জয়।
ক্ষমতা।
সম্পদ।
প্রতিপক্ষকে হারানো।
কিন্তু নবী করিম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের জীবন বিজয়ের আরেকটি ছবি দেখায়।
কখনো বিজয় মানে—
বিপদের মধ্যেও সৎ থাকা।
কখনো বিজয় মানে—
হতাশ না হওয়া।
কখনো বিজয় মানে—
কারও পাশে দাঁড়ানো।
কখনো বিজয় মানে—
আজকের দিনটি পার করে আগামীকাল পর্যন্ত পৌঁছানো।
কখনো বিজয় মানে—
ভয় পেলেও সঠিক কাজটি করা।
এমনকি কখনো বিজয় মানে—
ক্ষমা করার ক্ষমতা রাখা।
শেষ দৃশ্য
আবার মরুভূমিতে ফিরে যাই।
রাত।
দূরে ঘোড়ার শব্দ।
পেছনে শত্রু।
সামনে অজানা পথ।
হযরত আবু বকর রাদিয়াল্লাহু তা’আলা আনহু উদ্বিগ্ন।
কিন্তু মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম সামনে তাকিয়ে আছেন।
হয়তো তিনি জানেন না সামনে ঠিক কী অপেক্ষা করছে।
কিন্তু তিনি জানেন—
কেন তিনি যাচ্ছেন।
এবং কার ওপর তাঁর ভরসা।
এই পার্থক্যটিই হয়তো মানুষের জীবনের সবচেয়ে বড় পার্থক্য।
আমরা অনেক সময় ভবিষ্যৎ সম্পর্কে নিশ্চিত হতে চাই।
কিন্তু জীবন কাউকে সেই নিশ্চয়তা দেয় না।
কেউ জানে না আগামীকাল কী হবে।
কেউ জানে না পাঁচ বছর পরে কোথায় থাকবে।
কেউ জানে না আজকের দুঃখ কখন শেষ হবে।
কিন্তু একজন বিশ্বাসী মানুষ অন্য একটি নিশ্চয়তা নিয়ে বাঁচতে পারে—
ফলাফল আমার হাতে নয়। আমার কাজটি আমার হাতে।
তাই সে প্রস্তুতি নেয়।
হাঁটে।
পড়ে গেলে উঠে দাঁড়ায়।
ভয় পেলে আবার হাঁটে।
আর যখন চারপাশের পৃথিবী তাকে বলে—
“পেছনে তাকাও, বিপদ আসছে”—
তখন তার হৃদয় থেকে একটি শব্দ উঠতে পারে—
আল্লাহ।
ভিওআইবি আন্তর্জাতিক ফিচার | শেষ কথা
চৌদ্দশ বছর পেরিয়ে গেছে।
সাম্রাজ্য এসেছে।
সাম্রাজ্য চলে গেছে।
মানচিত্র বদলেছে।
শহর বদলেছে।
মানুষের প্রযুক্তি বদলেছে।
কিন্তু মানুষের হৃদয় খুব বেশি বদলায়নি।
আজও মানুষ ভয় পায়।
আজও মানুষ ভবিষ্যৎ নিয়ে চিন্তা করে।
আজও মানুষ জানতে চায়—
“আমি কি পারব?”
হিজরতের মরুভূমি যেন দূর অতীত থেকে ধীরে ধীরে উত্তর দেয়—
পারবে।
তবে তার মানে এই নয় যে পথ সহজ হবে।
তার মানে হলো—
তুমি পথ চলার মতো সাহস পাবে।
প্রস্তুতি নাও।
চেষ্টা করো।
মানুষের পাশে দাঁড়াও।
নীতিকে আঁকড়ে ধরো।
আতঙ্ককে তোমার সিদ্ধান্তের মালিক হতে দিও না।
আর যে জায়গায় মানুষের ক্ষমতা শেষ হয়ে যায়—
সেখানে বিশ্বাসের দরজা খুলে দাও।
কারণ ঝড় থামবেই—এমন প্রতিশ্রুতি জীবনে নেই।
কিন্তু ঝড়ের মধ্যে দাঁড়িয়ে থাকা যায়।
অন্ধকারের মধ্যেও হাঁটা যায়।
হারানোর মধ্যেও আশা রাখা যায়।
আর কখনো কখনো—
একটি ছোট্ট দল, একটি ছোট্ট বিশ্বাস এবং একটি অদৃশ্য ভবিষ্যতের স্বপ্ন—
ইতিহাসের গতিপথ বদলে দিতে পারে।
মরুভূমি তখনও ছিল।
আজও মরুভূমি আছে।
শুধু মরুভূমির রূপ বদলেছে।
আর পথিকের সামনে আজও একই প্রশ্ন—
“যখন পথ অন্ধকার হয়ে যাবে, তুমি কিসের ওপর ভরসা করে সামনে হাঁটবে?”
ভিওআইবি আন্তর্জাতিক ফিচার
কারণ কখনো কখনো ইতিহাস শুরু হয় তখনই—
যখন একজন মানুষ ভয়ের দিকে তাকিয়ে না থেকে সামনে হাঁটা শুরু করে।