
VOIB | বিশেষ ফিচার
ধর্ম ও তরুণ প্রজন্মের ভবিষ্যৎ
আধ্যাত্মিক বিপ্লব
নামাজ, শৃঙ্খলা ও বিশ্বাস—ধর্মনিরপেক্ষ সময়ের চাপের মুখে বৈশ্বিক এক মুসলিম তরুণ আন্দোলনের ভেতরের গল্প
সাইফুল ইসলাম
যে প্রশ্নের মুখোমুখি একটি প্রজন্ম
আধুনিক তরুণের জীবন যেন শব্দে ঘেরা।
সকালে ঘুম ভাঙার আগেই ফোনে নোটিফিকেশন। মনোযোগ কেড়ে নিতে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের প্রতিযোগিতা। একজন মানুষ কী দেখতে পছন্দ করেন, অ্যালগরিদম তা শিখে নেয়—তারপর একই ধরনের আরও কিছু সামনে হাজির করে। সাফল্যের মাপকাঠিও বদলে গেছে। বেতন, অনুসারীর সংখ্যা, পেশাগত পরিচিতি—সবকিছু মিলিয়ে যেন তৈরি হচ্ছে নতুন এক সামাজিক মানদণ্ড। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের প্রোফাইলের মতোই কখনো কখনো পরিচয়ও হয়ে উঠছে বদলযোগ্য।
কিন্তু বিশ্বের বিভিন্ন প্রান্তের মসজিদ, কমিউনিটি সেন্টার ও সমাবেশস্থলে একই সময়ে চলছে অন্য রকম এক পরীক্ষা।
তরুণ মুসলমানদের সামনে রাখা হচ্ছে আপাতদৃষ্টিতে সহজ একটি প্রশ্ন—
বিশ্বাস যদি শুধু পরিচয় না হয়ে জীবনের শৃঙ্খলায় পরিণত হয়, তাহলে কী বদলাতে পারে?
খুদ্দামুল আহমদিয়া—সাধারণত ১৫ থেকে ৪০ বছর বয়সী তরুণদের সংগঠন—এবং আতফালুল আহমদিয়া—৭ থেকে ১৫ বছর বয়সী ছেলেদের সংগঠন—এই প্রশ্নের উত্তর খোঁজে নামাজ, নৈতিক শৃঙ্খলা ও মানবসেবার মধ্য দিয়ে।
এই তরুণদের কেউ শিক্ষার্থী, কেউ প্রকৌশলী, কেউ চিকিৎসক, উদ্যোক্তা, গবেষক, কারিগরি পেশাজীবী কিংবা অন্য কোনো পেশার সঙ্গে যুক্ত। প্রযুক্তি তাদের জীবনের স্বাভাবিক অংশ। ব্যক্তিস্বাধীনতার সুযোগও আগের যেকোনো প্রজন্মের তুলনায় বেশি।
কিন্তু এই আন্দোলন তাদের সামনে আরও একটি অগ্রাধিকারের কথা তুলে ধরে—
ইচ্ছার আগে দায়িত্ব, বিভ্রান্তির আগে ইবাদত এবং বাহ্যিক পরিচয়ের আগে চরিত্র।
চ্যালেঞ্জটি সহজ নয়।
আর এর নেতৃত্বের বক্তব্য হলো, এই আন্দোলনের সাফল্য শুধু সদস্যসংখ্যা, শিক্ষা কিংবা সাংগঠনিক সক্ষমতা দিয়ে মাপা যায় না।
এর চূড়ান্ত ভিত্তি এমন এক বিষয়, যা চোখে দেখা যায় না—
আল্লাহর অনুগ্রহ এবং ব্যক্তির তাকওয়া।
০১ | জাগরণ
একটি যুব সংগঠন সময়ানুবর্তিতা শেখাতে পারে। আয়োজন করতে পারে খেলাধুলা, সম্মেলন, প্রশিক্ষণ ও স্বেচ্ছাসেবামূলক কর্মসূচি।
কিন্তু এই আন্দোলনের গভীরতর লক্ষ্য আধ্যাত্মিক।
সদস্যদের বারবার মনে করিয়ে দেওয়া হয়—ন্যায়পরায়ণতা ও আল্লাহভীতি ছাড়া জ্ঞান অহংকারের কারণ হতে পারে। নৈতিকতা ছাড়া শক্তি ধ্বংসাত্মক হয়ে উঠতে পারে। আর আধ্যাত্মিকতার ভিত্তি দুর্বল হলে সাংগঠনিক দক্ষতাও একসময় কেবল বাহ্যিক কাঠামোয় পরিণত হতে পারে।
এই দর্শনের কেন্দ্রে রয়েছে তাকওয়া—আল্লাহর উপস্থিতি ও জবাবদিহির এমন এক গভীর অনুভূতি, যা অন্য কেউ না দেখলেও মানুষের সিদ্ধান্তকে প্রভাবিত করে।
এতে সাফল্যের সংজ্ঞাটিও বদলে যায়।
একজন তরুণের বিশ্ববিদ্যালয়ের ডিগ্রি থাকতে পারে। সফল ক্যারিয়ার থাকতে পারে। থাকতে পারে আর্থিক নিরাপত্তা।
তবু মূল প্রশ্নটি থেকে যায়—
সে মানুষ হিসেবে কেমন হয়ে উঠেছে?
এই প্রশ্নের উত্তর খোঁজা হয় দুটি পরস্পরসম্পর্কিত দায়িত্বের মধ্য দিয়ে।
হক্কুল্লাহ—আল্লাহর প্রতি মানুষের দায়িত্ব।
এবং
হক্কুল-ইবাদ—আল্লাহর সৃষ্টির প্রতি মানুষের দায়িত্ব।
প্রথমটি দাবি করে ইবাদত, কৃতজ্ঞতা ও আনুগত্য।
দ্বিতীয়টি দাবি করে সততা, সহমর্মিতা, ন্যায়বিচার ও সেবা।
দুটিকে আলাদা করে দেখার সুযোগ নেই।
কারণ একজন মানুষ আল্লাহর নৈকট্যের দাবি করবেন, অথচ ইচ্ছাকৃতভাবে তাঁর সৃষ্টির ক্ষতি করবেন—এ দুটি বিষয় পরস্পরের সঙ্গে সাংঘর্ষিক।
> “সাফল্য সদস্যদের সক্ষমতার ওপর নির্ভর করে না; বরং আল্লাহর অনুগ্রহ, তাকওয়া অবলম্বন এবং স্রষ্টার সঙ্গে গভীর সম্পর্ক স্থাপনের ওপর নির্ভর করে।”
তরুণদের প্রতি এই আন্দোলনের আহ্বানের কেন্দ্রে রয়েছে এই নীতিই।
০২ | একটি ভবিষ্যদ্বাণীর উত্তরাধিকার
আহমদি মুসলমানদের কাছে এই গল্প কোনো আধুনিক যুব সংগঠন দিয়ে শুরু হয় না।
এর শিকড় আরও গভীরে—ইসলামের ভবিষ্যদ্বাণী ও আধ্যাত্মিক ইতিহাসে।
তাঁদের বিশ্বাস, মহানবী হজরত মুহাম্মদ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) ইসলামের ভবিষ্যৎ সম্পর্কে এমন এক সময়ের কথা জানিয়েছেন, যখন আধ্যাত্মিক অবক্ষয় দেখা দেবে এবং পরবর্তী সময়ে আল্লাহর পক্ষ থেকে একজন সংস্কারকের আবির্ভাব ঘটবে।
দীর্ঘ প্রতীক্ষার পর আহমদি মুসলমানরা বিশ্বাস করেন, হজরত মির্জা গোলাম আহমদ (আ.)-কে আল্লাহ প্রতিশ্রুত মসীহ ও মাহদি হিসেবে প্রেরণ করেছেন—ইসলামের মূল ও শান্তিপূর্ণ শিক্ষাকে পুনরুজ্জীবিত করার জন্য।
আজকের আহমদি তরুণদের কাছে এই বিশ্বাস শুধু একটি ঐতিহাসিক পরিচয় নয়।
এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে দায়িত্ববোধ।
প্রশ্নটি তাই দাঁড়ায়—
যদি এটি প্রতিশ্রুত সংস্কারকের যুগ হয়, তাহলে তাঁর অনুসারীদের কেমন হওয়া উচিত?
আহমদিয়া শিক্ষার উত্তর রাজনৈতিক ক্ষমতা কিংবা পার্থিব আধিপত্য নয়।
উত্তর হলো নৈতিক পরিবর্তন।
যে ব্যক্তি বাইআত গ্রহণ করেন, তাঁর কাছে এটি এমন একটি জীবনপদ্ধতির অঙ্গ, যেখানে পার্থিব আকর্ষণের ওপর ঈমানকে অগ্রাধিকার দেওয়ার অঙ্গীকার থাকে।
বাইআত তাই কেবল আনুষ্ঠানিক ঘোষণা নয়।
এটি জীবনযাপনের একটি কর্মসূচি।
আর স্বাধীনতার নানা সংজ্ঞায় ঘেরা একটি প্রজন্মের কাছে সেই কর্মসূচির একটি গুরুত্বপূর্ণ দাবি হলো—
আত্মসংযম।
০৩ | প্রতিদিনের পাঁচটি বিরতি
এই শৃঙ্খলার সবচেয়ে স্পষ্ট প্রকাশ সম্ভবত সালাতে।
দিনে পাঁচবার আধুনিক পৃথিবীকে যেন একটু থামতে হয়।
ই-মেইল অপেক্ষা করতে পারে।
পরীক্ষা অপেক্ষা করতে পারে।
ব্যবসায়িক বৈঠক অপেক্ষা করতে পারে।
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের অন্তহীন স্ক্রলও অপেক্ষা করতে পারে।
মুমিন দাঁড়ান তাঁর রবের সামনে।
আহমদিয়া শিক্ষায় পাঁচ ওয়াক্ত নামাজ শুধু দৈনন্দিন ধর্মীয় কর্তব্য নয়। এটি মানুষের নৈতিক পরিবর্তনের একটি নিয়মিত অনুশীলন হিসেবে বিবেচিত।
কোরআনে নামাজকে এমন ইবাদত হিসেবে বর্ণনা করা হয়েছে, যা অশ্লীলতা ও অন্যায় থেকে মানুষকে বিরত রাখে।
নীতিটি তাই সরল—
নামাজ যদি মানুষকে বদলাতে না পারে, তবে নামাজের কোনো গুরুত্বপূর্ণ দিক হয়তো এখনো জীবন্ত হয়নি।
তাই তরুণদের মনে করিয়ে দেওয়া হয়, শুধু শারীরিক কিছু কাজ সম্পন্ন করাই নামাজের উদ্দেশ্য নয়।
উদ্দেশ্য হৃদয়কে জাগ্রত করা।
সর্বশ্রোতার সামনে দাঁড়ানো।
সর্বজ্ঞের সঙ্গে কথা বলা।
সর্বশক্তিমানের কাছে সাহায্য চাওয়া।
তারপর সেই আল্লাহ-সচেতনতা নিয়ে আবার দৈনন্দিন জীবনে ফিরে যাওয়া।
ব্যবসায়ী তাঁর কর্মস্থলে ফিরবেন।
শিক্ষার্থী শ্রেণিকক্ষে যাবে।
পেশাজীবী কম্পিউটার খুলবেন।
তরুণ আবার সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ফিরবে।
কিন্তু নৈতিক মানদণ্ডটি বদলাবে না।
কেউ দেখছে না বলে অসততা নয়।
লাভের সুযোগ আছে বলে অন্যের শোষণ নয়।
ধরা পড়ার সম্ভাবনা কম বলে আইন ভঙ্গ নয়।
অ্যালগরিদম সামনে এনে দিয়েছে বলে অনলাইন প্রলোভনের কাছে আত্মসমর্পণ নয়।
এই অর্থে নামাজ জীবন থেকে পালিয়ে যাওয়ার পথ নয়।
বরং জীবনকে সঠিকভাবে পরিচালনার প্রশিক্ষণ।
০৪ | যে ভান্ডার কখনো ফুরায় না
এই আন্দোলনের শিক্ষায় আরেকটি বিষয় বিশেষ গুরুত্ব পায়—দোয়ার শক্তি।
মানবিক প্রতিষ্ঠান সীমাবদ্ধতার মধ্যে কাজ করে।
সরকারের বাজেট সীমিত।
ব্যবসার মূলধন সীমিত।
পরিবারের সম্পদ সীমিত।
মানুষের নিজের শক্তিরও একসময় সীমা এসে যায়।
কিন্তু বিশ্বাসীদের কাছে আল্লাহর ক্ষমতার কোনো এমন সীমা নেই।
আল্লাহর ভান্ডার মানুষের প্রয়োজনের কারণে নিঃশেষ হয়ে যায় না।
তরুণ বিশ্বাসীর কাছে এই ধারণা কঠিন সময়ের অর্থও বদলে দিতে পারে।
ব্যর্থতা তখন চূড়ান্ত পরিণতি নয়।
ভয় ভবিষ্যৎ নির্ধারণ করে না।
একটি বন্ধ দরজা মানেই পথের শেষ নয়।
দোয়া তখন শুধু নির্ভরতার প্রকাশ নয়—সাহসেরও প্রকাশ।
মুমিন প্রার্থনা করেন, চেষ্টা করেন, সংগ্রাম করেন, ধৈর্য ধরেন; একই সঙ্গে স্বীকার করেন—চূড়ান্ত ক্ষমতা আল্লাহর হাতে।
চেষ্টা ও দোয়ার এই সম্পর্কটিই এখানে গুরুত্বপূর্ণ।
ঈমান দায়িত্ব থেকে পালিয়ে যাওয়ার নাম নয়।
বরং এর অর্থ হলো—দায়িত্ব পালন করতে হবে, কিন্তু মানুষকে বিশ্বাস করতে হবে না যে সবকিছু তাকে একাই বহন করতে হবে।
০৫ | শৃঙ্খলা যখন ভ্রাতৃত্বে রূপ নেয়
শুধু ব্যক্তিগত ইবাদতের ওপর কোনো আধ্যাত্মিক আন্দোলন দীর্ঘদিন টিকে থাকতে পারে না।
এর প্রয়োজন সম্প্রদায় ও পারস্পরিক সম্পর্ক।
এখানেই আহমদিয়া মুসলিম জীবনে খিলাফত ধারণাটি গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে।
বাইআতের দশম শর্তে ভ্রাতৃত্বের বন্ধন প্রতিষ্ঠা এবং মারুফ বিষয়ে আনুগত্যের কথা বলা হয়েছে।
আরবি মারুফ শব্দের অর্থ ভালো, ন্যায়সংগত ও স্বীকৃত কল্যাণকর বিষয়।
আহমদিয়া ব্যাখ্যায় এই আনুগত্য ব্যক্তির খেয়ালখুশির প্রতি আনুগত্য নয়।
এটি পবিত্র কোরআন, মহানবী হজরত মুহাম্মদ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম)-এর সুন্নাহ এবং আল্লাহর বিধানের কাঠামোর মধ্যে বোঝানো হয়।
বিষয়টি গুরুত্বপূর্ণ।
আন্দোলনের নেতৃত্বের বক্তব্য হলো, প্রত্যেকে যদি নিজের ব্যক্তিগত পছন্দকে চূড়ান্ত কর্তৃত্ব হিসেবে গ্রহণ করেন, তাহলে কোনো সম্প্রদায়ের ঐক্য টিকিয়ে রাখা কঠিন।
একজন এক নির্দেশনা অনুসরণ করবেন।
অন্যজন অন্যটি।
তৃতীয়জন নিজের ব্যাখ্যা দাঁড় করাবেন।
একসময় একটি সম্প্রদায় পরিণত হবে ভিন্ন ভিন্ন দিকে চলা ব্যক্তিদের সমষ্টিতে।
খিলাফতকে সেই বিভাজনের বিপরীতে ঐক্যের একটি কেন্দ্র হিসেবে উপস্থাপন করা হয়।
বিশ্বাসীদের কাছে এর উদ্দেশ্য হলো আধ্যাত্মিক ঐক্যের একটি কেন্দ্র তৈরি করা।
তবে এর সঙ্গে রয়েছে একটি দায়িত্বও।
আনুগত্য শুধু স্লোগানে সীমাবদ্ধ থাকতে পারে না।
তা আচরণে প্রকাশ পেতে হয়।
শপথকে পরিণত হতে হয় কাজে।
কবিতাকে পরিণত হতে হয় চরিত্রে।
বক্তৃতাকে পরিণত হতে হয় আত্মত্যাগে।
আর অঙ্গীকারকে পরিণত হতে হয় প্রতিদিনের জীবনে।
০৬ | শত্রু যখন খুব কাছেই
এই আন্দোলনের সবচেয়ে বড় সংগ্রাম অবশ্য অন্য কোনো গোষ্ঠীর বিরুদ্ধে নয়।
সংগ্রামটি নিজের সঙ্গে।
অহংকার।
রাগ।
অলসতা।
প্রবৃত্তির টান।
অসততা।
হিংসা।
স্বীকৃতি পাওয়ার আকাঙ্ক্ষা।
নীতির চেয়ে আরামকে বেশি গুরুত্ব দেওয়ার প্রবণতা।
এসব এমন শত্রু নয়, যাদের একবার পরাজিত করে চিরদিনের জন্য বিদায় জানানো যায়।
তারা প্রতিদিন ফিরে আসে।
এই কারণেই আধ্যাত্মিক বিপ্লবের শুরু ব্যক্তিগত পরিসরে।
একজন তরুণ সমাজ বদলানোর আগে তাকে আয়নার সামনে দাঁড়াতে হবে।
নৈতিকতার কথা বলার আগে তাকে নিজে তা পালন করতে হবে।
মানবতাকে আল্লাহর দিকে আহ্বান করার আগে তাকে নিজের স্রষ্টার সঙ্গে সম্পর্ক গড়ে তুলতে হবে।
তাই আন্দোলনের সবচেয়ে বড় পরীক্ষা তরুণেরা কত জোরে আনুগত্যের কথা বলতে পারেন, তা নয়।
বরং কেউ না দেখলেও সেই আনুগত্য কতটা টিকে থাকে—সেটিই আসল পরীক্ষা।
০৭ | দুই পৃথিবীর মাঝখানে একটি প্রজন্ম
এখানেই গল্পটি একটি নির্দিষ্ট ধর্মীয় সম্প্রদায়ের গণ্ডি ছাড়িয়ে আরও বড় হয়ে ওঠে।
বিশ্বজুড়ে তরুণেরা এক অভূতপূর্ব টানাপোড়েনের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে।
তাদের হাতে আগের যেকোনো প্রজন্মের চেয়ে বেশি তথ্য।
কিন্তু তথ্য মানেই জ্ঞান নয়।
তাদের স্বাধীনতা বেশি।
কিন্তু স্বাধীনতা মানেই আত্মসংযম নয়।
যোগাযোগের সুযোগ বেশি।
কিন্তু বেশি যোগাযোগ মানেই পারস্পরিক বোঝাপড়া নয়।
সাফল্যের সুযোগও বেশি।
কিন্তু সাফল্য মানেই জীবনের অর্থের উত্তর নয়।
আহমদিয়া যুব কর্মসূচি এই বাস্তবতার একটি নিজস্ব উত্তর দেয়।
এর বক্তব্য—আধুনিকতা ও ঈমান পরস্পরের শত্রু হতে হবে, এমন কোনো কথা নেই।
একজন তরুণ মুসলমান উচ্চশিক্ষা গ্রহণ করতে পারেন।
ক্যারিয়ার গড়তে পারেন।
প্রযুক্তিতে দক্ষ হতে পারেন।
সমাজসেবায় যুক্ত হতে পারেন।
ব্যবসা করতে পারেন।
বিজ্ঞান নিয়ে গবেষণা করতে পারেন।
শারীরিকভাবে সুস্থ থাকতে পারেন।
এবং একই সঙ্গে দিনে পাঁচবার আল্লাহর সামনে সিজদায় নত হতে পারেন।
চ্যালেঞ্জটি আধুনিক পৃথিবী থেকে পালিয়ে যাওয়া নয়।
বরং আধুনিক পৃথিবীতে প্রবেশ করেও নিজের আত্মাকে হারিয়ে না ফেলা।
০৮ | সেবার পরীক্ষা
ঈমানের চূড়ান্ত মাপকাঠি তাই একজন মানুষ কতটা পেয়েছেন, তা নয়।
বরং তিনি কতটা দিতে পেরেছেন।
মানবসেবার ওপর এই আন্দোলনে বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হয়।
হক্কুল-ইবাদ ধর্মকে ব্যক্তিগত আধ্যাত্মিকতার গণ্ডি পেরিয়ে সামাজিক দায়িত্বে পরিণত করে।
একজন মুমিনের দায়িত্ব হলো ক্ষুধার্ত মানুষের কথা ভাবা, অসুস্থ মানুষের পাশে দাঁড়ানো, প্রতিবেশীর খোঁজ নেওয়া, অপরিচিত মানুষের প্রতিও সহমর্মী হওয়া এবং দুর্বল মানুষের পাশে দাঁড়ানো।
মসজিদ হয় নামাজের স্থান।
কিন্তু ঈমানের প্রভাব মসজিদের দেয়ালের মধ্যে আটকে থাকার কথা নয়।
তা পৌঁছাবে হাসপাতালে।
স্কুলে।
দুর্যোগকবলিত মানুষের কাছে।
বিভিন্ন সম্প্রদায়ের মধ্যে।
এমনকি এমন সব ছোট ছোট মানবিক কাজে, যেগুলো হয়তো কোনো সংবাদপত্রের পাতায় কখনোই জায়গা পাবে না।
একটি যুব আন্দোলনের জন্য এটিই বড় পরীক্ষা।
আধ্যাত্মিক শৃঙ্খলা কি সামাজিক দায়িত্ব তৈরি করতে পারে?
নামাজ কি সহমর্মিতা বাড়াতে পারে?
আনুগত্য কি আত্মত্যাগের জন্ম দিতে পারে?
ঈমান কি সেবায় রূপ নিতে পারে?
এসব প্রশ্নের উত্তর স্লোগানে দেওয়া যায় না।
জীবন দিয়ে তার উত্তর দিতে হয়।
০৯ | আধ্যাত্মিক বিপ্লব
ভোর হওয়ার আগে একজন তরুণের ঘুম থেকে উঠে নামাজ পড়ার দৃশ্য হয়তো খুব সাধারণ।
কেউ ক্যামেরা নিয়ে সেখানে উপস্থিত থাকার প্রয়োজন নেই।
কেউ হাততালি দেবে না।
কোনো অ্যালগরিদমও এর জন্য পুরস্কার দেবে না।
সম্ভবত এটাই মূল কথা।
এই আন্দোলন তরুণদের এমন এক বিপ্লবের দিকে আহ্বান জানায়, যার সূচনা সাধারণত আধুনিক বিপ্লবগুলোর মতো বাইরে নয়—
মানুষের ভেতরে।
এর অস্ত্র সহিংসতা নয়, জবরদস্তিও নয়।
এর অস্ত্র নামাজ, জ্ঞান, শৃঙ্খলা, নৈতিক সাহস ও মানবসেবা।
এর যুদ্ধক্ষেত্র মানুষের হৃদয়।
এর লক্ষ্য আধিপত্য নয়।
পরিবর্তন।
আর এর চূড়ান্ত সাফল্য কতজন মানুষ কতটা ক্ষমতাবান হলো, তা দিয়ে নির্ধারিত হবে না।
নির্ধারিত হবে তারা নিজেদের বিশ্বাস করা মূল্যবোধ কতটা বিশ্বস্ততার সঙ্গে জীবনে ধারণ করতে পারল—তা দিয়ে।
শেষ প্রশ্ন
প্রতিটি প্রজন্মের সামনে কোনো না কোনোভাবে একই প্রশ্ন ফিরে আসে—
আপনাকে যে জীবন দেওয়া হয়েছে, তা দিয়ে আপনি কী করবেন?
তরুণ আহমদি মুসলমানের কাছে এর একটি কাঠামোবদ্ধ উত্তর রয়েছে বাইআতের অঙ্গীকারে।
আল্লাহর ইবাদত করুন।
তাকওয়া অর্জন করুন।
আল্লাহর সৃষ্টির অধিকার রক্ষা করুন।
ঐক্য বজায় রাখুন।
মারুফ বিষয়ে আনুগত্য করুন।
মানবসেবা করুন।
নিজের দুর্বলতার বিরুদ্ধে সংগ্রাম করুন।
আর পৃথিবীর ক্ষণস্থায়ী আকর্ষণের ওপর ঈমানকে অগ্রাধিকার দিন।
অভূতপূর্ব বিভ্রান্তি ও মনোযোগ-ছিন্নতার মধ্যে বেড়ে ওঠা একটি প্রজন্মের জন্য এটি উচ্চাভিলাষী এক কর্মসূচি।
এই কর্মসূচি তরুণদের চরিত্র কতটা গড়ে তুলতে পারবে, তা শুধু কোনো ইজতেমার আকার, বক্তৃতার সংখ্যা কিংবা বাইআতের সময়কার আবেগ দিয়ে নির্ধারিত হবে না।
এর পরীক্ষা হবে আরও নীরবে।
ঘরে।
শ্রেণিকক্ষে।
কর্মস্থলে।
মুঠোফোনের পর্দায়।
ব্যবসায়িক লেনদেনে।
প্রলোভনের মুহূর্তে।
ভয়ের মুহূর্তে।
আর প্রতিদিন পাঁচবার—নামাজের নীরবতায়।
সেখানেই শুরু হয় আধ্যাত্মিক বিপ্লব।
পৃথিবীকে আগে বদলে দেওয়ার মধ্য দিয়ে নয়—পৃথিবীতে যে মানুষটি প্রবেশ করছে, তাকে আগে বদলে দেওয়ার মধ্য দিয়ে।