ফাঁসির মঞ্চে নীরবতা
বিদেশের মাটিতে মৃত্যুদণ্ড, রাষ্ট্রের সুরক্ষার মোহভঙ্গ এবং রেমিট্যান্সের নেপথ্যে অবহেলিত প্রবাসীদের অধিকারের সংকট। VOIB
অক্টোবরের এক নিস্তব্ধ ভোরে রিয়াদের আলো-আঁধারিতে সৌদি শরিয়া আইনের কঠোর রায়ে ইতি ঘটল দুটি তরতাজা প্রাণের। মক্কার একটি পবিত্র মসজিদের অভ্যন্তরে কথিত ‘অনৈতিক আচরণ’ ও অবমাননার অভিযোগে শিরশ্ছেদ করা হলো দুই বাংলাদেশি যুবক-যুবতীকে।
কিন্তু এই নিঃশংস পরিণতি কার্যকর হওয়ার কয়েক দিন পরও তাদের নিজ দেশ বাংলাদেশ এ বিষয়ে সম্পূর্ণ অন্ধকারে ছিল।
ঢাকায় যখন এই খবরের জের ধরে ক্ষোভ ও শোকের ঝড় উঠল, তখন দেখা গেল খবরটি কোনো সরকারি কূটনৈতিক চ্যানেলের মাধ্যমে আসেনি; এসেছে মৃত্যুদণ্ড কার্যকরের পর প্রকাশিত এক সংক্ষিপ্ত বার্তা হিসেবে। রিয়াদে যেখানে ৩০ লাখেরও বেশি বাংলাদেশি প্রবাসী কর্মরত, সেখানে বাংলাদেশ সরকার যেন এক অবাক শ্রোতা—যে ঘটনা ঘটে যাওয়ার পর তা জানতে পেরেছে।
টেলিভিশন টক-শো নিউজি চ্যাট-এ সুপ্রিম কোর্টের ব্যারিস্টার মিতি সঞ্জনার বিশ্লেষণসহ সম্প্রতি উন্মোচিত এই ঘটনাটি বৈশ্বিক অর্থনীতির এক নির্মম সত্যকে সামনে এনে দিয়েছে: প্রবাসীদের পাঠানো বিলিয়ন বিলিয়ন ডলারের রেমিট্যান্সে যেসব দেশের অর্থনীতির চাকা ঘোরে, সেই দেশগুলোই বিদেশের বিচারব্যবস্থার কঠিন চক্রে আটকে পড়া নিজ নাগরিকদের রক্ষায় কতটা নিঃসহায় ও উদাসীন।
গোপনীয়তার বিচার ও কূটনৈতিক ব্যর্থতা
সৌদি কর্তৃপক্ষের বক্তব্য অনুযায়ী, ওই দুই তরুণ-তরুণী মক্কার একটি মসজিদের ভেতর অনৈতিক কার্যকলাপে লিপ্ত হয়ে ধর্মীয় পবিত্রতা নষ্ট করেছিলেন। দেশটির শরিয়া আইনের ‘তাজির’ ব্যবস্থার আওতায় বিচারক নিজ বিবেচনায় এমন শাস্তির নির্দেশ দেন। ‘তাজির’ এমন একটি বিচারিক ক্ষমতা যেখানে অপরাধের সুনির্দিষ্ট সংবিধিবদ্ধ সাজা নির্ধারিত না থাকলেও বিচারক অনৈতিকতা বা ধর্মীয় অবমাননার অভিযোগে মৃত্যুদণ্ডের মতো সর্বোচ্চ সাজা দিতে পারেন।
কয়েক মাস ধরে চলা গোপন এই বিচার প্রক্রিয়ায় ন্যূনতম কনস্যুলার বা কূটনৈতিক উপস্থিতি ছিল না। ‘ভিয়েনা কনভেনশন অন কনস্যুলার রিলেশনস’-এর অনুচ্ছেদ ৩৬ অনুযায়ী, কোনো বিদেশি নাগরিক গ্রেপ্তার হলে তৎক্ষণাৎ তার দেশের দূতাবাসকে তা জানানো এবং আইনি সহায়তা ও আত্মপক্ষ সমর্থনের সুযোগ নিশ্চিত করা বাধ্যতামূলক। অথচ প্রতিবেদন অনুযায়ী, রিয়াদে অবস্থিত বাংলাদেশ দূতাবাসকে শুরু থেকে কোনো তথ্যই দেওয়া হয়নি।
“একুশ শতকে এসে এটি একটি অত্যন্ত বর্বর ঘটনা,” নিউজি চ্যাট-কে বলেন ব্যারিস্টার মিতি সঞ্জনা। “অপরাধের ধরণ যাই হোক না কেন, তাদের কি আত্মপক্ষ সমর্থনের সুযোগ দেওয়া হয়েছিল? তারা কি কোনো আইনজীবী পেয়েছিলেন? রাষ্ট্র তখন কোথায় ছিল?”
কূটনৈতিক সূত্রে জানা গেছে, সেপ্টেম্বর মাসে সৌদি কারাগারে বন্দি আড়াই হাজার বাংলাদেশির যে সাধারণ তালিকা রিয়াদ দূতাবাসকে দেওয়া হয়েছিল, সেখানে এই দুজনের নামও ছিল। তবে দূতাবাস কর্মকর্তারা অপরাধের ভয়াবহতা কিংবা তাদের সম্ভাব্য মৃত্যুদণ্ডের ঝুঁকি বুঝতে বা চিহ্নিত করতে ব্যর্থ হন। সমালোচকদের মতে, এই অবহেলা প্রবাসীদের কেবল ‘রেমিট্যান্সের সংখ্যা’ হিসেবে বিবেচনা করার এক দীর্ঘদিনের প্রাতিষ্ঠানিক মানসিকতারই প্রতিফলন।
রেমিট্যান্সের ফাঁদ: শ্রমজীবী নাকি সস্তা পণ্য?
এই ঘটনাটি মধ্যপ্রাচ্যে কর্মরত নিম্নআয়ের অভিবাসী শ্রমিকদের চরম নিরাপত্তাহীনতাকে আবার সামনে এনেছে। ভালো ভবিষ্যতের আশায় জমিজমা বিক্রি করে বা চড়া সুদে ঋণ নিয়ে দক্ষিণ এশিয়া ও আফ্রিকার লাখ লাখ মানুষ সৌদি আরবসহ বিভিন্ন দেশে পাড়ি জমান।
এসব শ্রমিকের পাঠানো অর্থ বাংলাদেশের বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভের মূল চালিকাশক্তি। অথচ অ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনাল ও হিউম্যান রাইটস ওয়াচ বারবার সতর্ক করে এসেছে যে, কীভাবে আইনি সুরক্ষাহীন অবস্থায় এসব প্রবাসী জীবনযাপন করেন।
রিয়াদ ও জেদ্দার চোখধাঁধানো অট্টালিকার আড়ালে তারা তথাকথিত ‘কফিল’ বা নিয়োগকর্তাদের জিম্মি হয়ে পড়েন। পাসপোর্ট কেড়ে নেওয়া, বেতন বকেয়া রাখা এবং অমানবিক শারীরিক ও যৌন নির্যাতনের ঘটনা সেখানে নিত্যদিনের। নির্যাতনের শিকার নারী গৃহকর্মীরা পুলিশের কাছে গিয়েও ভাষার বাধা ও চরম আইনি জটিলতার মুখে পড়েন। অনেক সময় উল্টো তাদের বিরুদ্ধেই ‘অবৈধ গর্ভধারণ’ বা ব্যভিচারের অভিযোগ এনে গ্রেপ্তার করা হয়।
“অনেক সময় দেখা যায়, কফিনে করে দেশে আসা মরদেহের মৃত্যুসনদে ‘স্বাভাবিক মৃত্যু’ বা ‘হৃদরোগ’ লেখা থাকে, অথচ দেশে পৌঁছানোর পর ময়নাতদন্তে স্পষ্ট আঘাতের চিহ্ন মেলে,” বলেন ব্যারিস্টার সঞ্জনা। “অথচ কোনো রিক্রুটিং এজেন্সিকে জবাবদিহিতার আওতায় আনা হয় না, কোনো নিয়োগকর্তার বিচার হয় না।”
সার্বভৌমত্ব ও রাষ্ট্রীয় সদিচ্ছার পরীক্ষা
মৃত্যুদণ্ড কার্যকরের পর ঢাকার পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের প্রাথমিক প্রতিক্রিয়া সাধারণ মানুষকে আরও ক্ষুব্ধ করেছে। সরকারের তরফ থেকে কেবল বলা হয়েছে, বিদেশে গেলে সেখানকার আইন মেনে চলা উচিত—যা দায়িত্ব এড়ানোর শামিল বলেই মনে করছেন বিশ্লেষকরা।
সমালোচকদের মতে, স্বাগতিক দেশের আইন মানার বাধ্যবাধকতা থাকলেও আন্তর্জাতিক আইন অনুযায়ী কনস্যুলার সুরক্ষা নিশ্চিত করা নিজ দেশের সরকারের দায়িত্ব। উদাহরণস্বরূপ, শ্রীলঙ্কা বা অন্যান্য দেশ কঠোর কূটনৈতিক তৎপরতা, গণমাধ্যম পর্যবেক্ষণ ও সরকারের উচ্চপর্যায়ের হস্তক্ষেপের মাধ্যমে বিদেশের মাটিতে নিজেদের নাগরিকদের মৃত্যুদণ্ড মওকুফ বা রদ করতে সক্ষম হয়েছে।
“যদি এই ঘটনা কোনো মার্কিন বা ব্রিটিশ নাগরিকের ক্ষেত্রে ঘটত, তবে তাদের সরকারের প্রতিক্রিয়া হতো তাৎক্ষণিক ও অত্যন্ত কঠোর,” সঞ্জনা উল্লেখ করেন। “কোনো পশ্চিমা নাগরিককে এভাবে গোপনে মৃত্যুদণ্ড দেওয়ার সাহস সৌদি কর্তৃপক্ষ পেত না।”
বাংলাদেশ যেন এক অসম কূটনৈতিক সম্পর্কের জালে আটকে আছে। অর্থনৈতিক নির্ভরতা এবং শ্রমবাজার হারানোর ভয়ে জিসিসি (GCC) দেশগুলোর বিরুদ্ধে কঠোর অবস্থান নিতে বারবার দ্বিধা প্রকাশ করেছে রাষ্ট্র।
আগামী দিনের পথ: বিচারের ময়নাতদন্ত
পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় বিলম্বে হলেও রিয়াদ থেকে ট্রায়াল বা বিচার প্রক্রিয়ার কাগজপত্র চেয়েছে। তবে এই ট্র্যাজেডি কাঠামোগত সংস্কারের দাবিকে জোরালো করেছে:
* বাধ্যতামূলক কনস্যুলার নজরদারি: গুরুতর অভিযোগে বন্দি প্রবাসীদের জন্য তাৎক্ষণিক আইনি সহায়তা ও ফান্ড নিশ্চিত করা।
* প্রযুক্তিভিত্তিক সাপোর্ট সিস্টেম: প্রবাসীদের ট্র্যাকিং, জরুরি হেল্পলাইন এবং নিরাপদ আশ্রয়কেন্দ্র (Safe House) বৃদ্ধি করা।
* দ্বিপাক্ষিক শ্রম চুক্তির শর্ত সংশোধন: মানবাধিকার ও স্বচ্ছ বিচার প্রক্রিয়ার নিশ্চয়তা ছাড়া শ্রমশক্তি পাঠানোর নীতি পুনর্বিবেচনা করা।
মক্কায় ঘটে যাওয়া এই জোড়া মৃত্যুদণ্ড কেবল একটি বিচ্ছিন্ন ট্র্যাজেডি নয়; এটি রাষ্ট্রের জন্য এক নৈতিক আয়না। এটি স্পষ্ট করে দেয় যে, অরক্ষিত শ্রমিকের ওপর ভর করে অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি অর্জন করার এক চরম মানবিক মূল্য রয়েছে। যতক্ষণ না বিদেশের মাটিতে একজন নাগরিকের জীবনকে রেমিট্যান্সের অংকের চেয়ে বেশি গুরুত্ব দেওয়া হবে, ততক্ষণ পর্যন্ত ফাঁসির এই মঞ্চগুলো এক ভাঙা সামাজিক চুক্তির নীরব সাক্ষী হয়েই থাকবে।
